নাটকের একটি মুহূর্ত। —নিজস্ব চিত্র।
বন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখার নাটক। মৃত্যুকে পরাজিত করতে নাটক। কৃষ্ণনগর পুরসভার দ্বিজেন্দ্র সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হল দু’দিনের নাট্য উৎসব। তাকে ঘিরে এমনই অনুভূতি জড়িয়ে আছে শহরের নাট্যকর্মীদের মধ্যে। গুরুতর অসুস্থ এক সহযোদ্ধাকে বাঁচানোর উপায় খুঁজতে এই নাট্যোৎসব।
প্রথম দিন ১ জুলাই মঞ্চস্থ হয় কৃষ্ণনগর থিয়াসের ‘কোরিওলেনাস আজও’ ও কৃষ্ণনগর থিয়েটার অঙ্গনের ‘উল্টে দেখুন পাল্টে গেছি।’ আর ২ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে কৃষ্ণনগর সিঞ্চনের ‘দি ইনক্যুইজিশন’ ও কৃষ্ণনগর রূপকথার ‘হট্টমালার ওপারে।’ দু’দিনই হাউসফুল হল।
কৃষ্ণনগরের নাট্য জগতের পরিচিত নাম রাজীব সাহা। মাস তিনেক আগে সেলিব্রাল অ্যাটাকে গুরুতর অসুস্থ্ হয়ে পড়েছেন রাজীব। পরিবার সব পুঁজি উজাড় করে দিয়েও কুলোতে পারছে না। সেই প্রয়োজনের থেকেই এ বার নাটক মঞ্চস্থ্ করতে এগিয়ে এসেছেন শহরের বিভিন্ন নাটকের দল। এগিয়ে এসেছেন আবহ শিল্পীরা। লাইট, মাইকের ব্যবসায়ীরাও।
শহরের এক নাট্যকর্মীর কথায়,‘‘আমরা আর কিইবা করতে পারি। আমরা যেটা পারি তা হল নাটক করতে। নাটককেই তাই এই লড়াইয়ে হাতিয়ার করছি।’’ এই দু’দিনের নাটকের অনুষ্ঠান করে যে টিকিট বিক্রি বা অনুদানের যে টাকা উঠবে তা পুরোটাই তুলে দেওয়া হবে রাজীববাবুর পরিবারের হাতে। আর তাই নাটকের দলগুলিও কোন টাকা নিচ্ছেন না। টাকা নিচ্ছেন না আবহ শিল্পীরাও। আলো আর মাইকের ব্যবসায়ীরা শুধু ‘লেবার চার্জ’ নিয়েছেন।
এই অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা তৃষিত মিত্র বলেন, ‘‘আমরা যার কাছে গিয়েছি, সেই তার মতো করে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। টিকিটের দাম করা হয়েছিল ১০০ টাকা। কিন্তু অনেকেই তার অনেক বেশি টাকা দিয়ে টিকিট নিয়েছে। ভাবতে ভালো লাগছে যে, আমরা যার কাছেই গিয়েছে কেউই আমাদের ফিরিয়ে দেয়নি।’’
রাজীব সাহার বাড়ি কৃষ্ণনগরের শক্তিনগর এলাকায়। প্রথমে ‘অন্যমুখ’ নাট্যগোষ্ঠীর মাধ্যমে তাঁর নাট্যজগতে প্রবেশ। পরে তিনি নিজেই ‘শৈল্পিক’ নামে একটা নাটকের দল গঠন করেন। নাটকের পাশাপাশি তিনি একটি অভিনয়ের স্কুলও চালাতেন। আর এসবের পাশাপাশি জীবিকা হিসাবে মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভের কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে আচমকা তাঁর সেলিব্রাল অ্যাটাক হয়। সেবার সেই ধাক্কা কোনও মতে সামলে নিলেও মাস তিনেক আগে আবার তিনি আক্রান্ত হলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বারের ধাক্কা সামাল দেওয়া মোটেই সহজ ছিল না।
এই লড়াইয়ে সামিল হলেন কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন প্রান্তের নাট্যকর্মীরা। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শহরের বুকে নিয়মিত নাট্য চর্চা করার জন্য বিভিন্ন নাট্য গোষ্ঠী মিলে তৈরি করেছিলেন ‘নাট্যবন্ধু’ মানে একটি সংস্থা। একই ছাতার তলায় এসে তাঁরা প্রতি মাসের শেষ শনিবার কৃষ্ণনগরের রবীন্দ্র ভবনে আয়েজন করতেন নাট্য উৎসবের। কিন্তু ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সংস্কারের জন্য রবীন্দ্র ভবনে অনুষ্ঠান করা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার পর থেকে আর কোনও নাট্য উৎসবের আয়োজন করা যায়নি উপযুক্ত প্রেক্ষাগৃহের অভাবে।
এবার রবীন্দ্র ভবন না পাওয়া গেলেও, কৃষ্ণনগরের পুরসভার দ্বিজেন্দ্র সভাকক্ষে নাটকের উৎসবের আয়োজন করেছেন তাঁরা। তবে এই প্রেক্ষাগৃহে আসন সংখ্যামাত্র আড়ইশোটি। টিকিটের চাহিদা থাকলেও আড়াইশোর বেশি মানুষের কাছে তারা পৌঁছতে পারেননি।
নাট্যবন্ধু-র সম্পাদক কাজল মৈত্র বলেন, ‘‘আমরা আসলে ভাবতে পারিনি যে এত মানুষ আমাদের পাশে থাকবেন। তার উপরে সময়ও বেশি ছিল না। আবার যদি আমরা রাজীবের জন্য কোন অনুষ্ঠান করি তাহলে রবীন্দ্র ভবনেই করব।’’