চলছে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা নাটকের মহড়া।—নিজস্ব চিত্র
বহরমপুরকে টেক্কা দিতে ‘নাট্যদর্শন’-এ মেতেছে রঘুনাথগঞ্জ। আজ, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় নাট্যোমোদী দর্শকের ভিড়ে গমগম করবে রঘুনাথগঞ্জ রবীন্দ্রভবন। রঘুনাথগঞ্জের ‘নাট্যম বলাকা’ আয়োজিত ‘নাট্যদর্শন ২০১৫’ শীর্ষক ১৫তম বছরের নাট্যোৎসব চলবে ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। বহরমপুরের ‘ঋত্বিক’ দেখাচ্ছে ১০ দিন ১২টি নাটক। সেক্ষেত্রে রঘুনাথগঞ্জের ‘নাট্যম বলাকা’ দেখাচ্ছে প্রতিদিন দু’টো করে পাঁচ দিনে মোট ১০টি নাটক। আসন সংখ্যায় এবং টিকিট বিক্রিতেও বহরমপুরের থেকে পিছিয়ে নেই রঘুনাথগঞ্জ।
বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে আসন ছিল ৭২৫টি। এ বছর সংস্কার করার সময় আসন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৫০। ঋত্বিকের নাট্যমেলার উদ্বোধনের আগেই সব টিকিট শেষ। প্রতিদিনের ‘তৎকাল’- এর জন্য রয়েছে মাত্র ৩০টি আসন। আর রঘুনাথগঞ্জ রবীন্দ্রভবনে আসন সংখ্যা ৭০০ থাকলেও ৫০০ জনের বেশি দর্শককে বসতে দেওয়া যায় না। আয়োজক সংস্থার কর্ণধার তরুণ চৌবে বলেন, ‘‘রবীন্দ্রভবন নির্মাণের সময় আসন এমন অবৈজ্ঞানিক ভাবে বসানো হয়েছে যে, মঞ্চের প্রযোজনা দেখতে পান না অনেকেই। এ কারণে খাতা-কলমে ৭০০ আসন থাকলে ৫০০ জনের বেশি দর্শককে বসতে দেওয়া যায় না।’’
ওই ৫০০ টিকিটের মধ্যে ৩৫০টি সিজন টিকিট হিসাবে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। প্রতিটি সিজন টিকিটের দাম ২০০ টাকা। তরুণবাবু বলেন, ‘‘প্রতিদিন কাউন্টার থেকে বিক্রি করার জন্য রয়েছে ১৫০ টিকিট।’’ ওই ‘তৎকাল’ টিকিটের দাম ৫০ টাকা। বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বের হাত ধরে উদ্বোধন হওয়ার বরাবরের ঐতিহ্য মেনে এ বার ঋত্বিকের পনেরোতম বছরের ‘দেশ বিদেশের নাট্যমেলা’র উদ্বোধন করেছেন ‘শূদ্রক’- এর কর্ণধার দেবাশিস মজুমদার। নাট্যম বলাকার পনেরোতম বছরের ‘নাট্যদর্শন’- এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানও ঐতিহ্য অনুসারি। বরাবরের মতো এ বারও রবীন্দ্রভবনের প্রবেশপথের সামনে সিঁড়িতে রাখা থাকবে বিশালাকৃতির পঞ্চপ্রদীপ। প্রজ্জ্বলিত মোমবাতির স্পর্শে সেই পিতলের পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে এ বারও দর্শকরাই ‘নাট্যদর্শন’- এর উদ্বোধন করবেন।
উদ্বোধনী সন্ধ্যায় প্রথম মঞ্চস্থ হবে আয়োজক সংস্থার প্রযোজনা ‘অক্টোপাস লিমিটেড’। প্রয়াত নাট্যকার মোহিত চটোপাধ্যায়ের ওই নাটকের নির্দেশক তরুণ চৌবে। দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চস্থ হবে সাঁইথিয়ার ‘ওয়েক আপ’ নাট্যসংস্থার প্রযোজনা ‘মরা চাঁদ’। বিজন ভট্টাচার্যের ওই নাটকের নির্দেশক অভি চক্রবর্তী। ওই দুই বিশিষ্ট নাট্যকার পূর্ববঙ্গে জন্মালেও প্রয়াত ওই দু’ জনের সঙ্গেই রয়েছে মুর্শিদাবাদের নিবিড় যোগ। জঙ্গিপুর কলেজের অধ্যাপক মোহিত চট্টোপাধ্যায় ১৯৬০ সাল নাগাদ রঘুনাথঞ্জে গড়ে তুলেছিলেন নাট্যদল। মহাশ্বেতাদেবীর স্বামী বিজন ভট্টাচার্য তো আবার বহরমপুরের জামাই।
উৎসবের দ্বিতীয় সন্ধ্যায় প্রথমে রয়েছে ‘ব্যান্ডেল আরোহী’র প্রযোজনা ‘হলুদ রঙের টি-শার্ট’। নাটক অমিতাভ চক্রবর্তী, নির্দেশক রঞ্জন রায়। দ্বিতীয় পর্বে সিউড়ির ‘আত্মজ’ মঞ্চস্থ করবে অতনু বর্মনের নাটক ‘অরূপ কথা’। নির্দেশনা মুকুল সিদ্দিকি। তৃতীয় দিনের প্রথম নাটক দত্ত পুকুরের ‘দৃষ্টি’র প্রযোজনা ‘জুতা আবিষ্কার’। রবীন্দ্রাথ ঠাকুরের কবিতার নাট্যরূপ দিয়েছেন বিপ্রতীপ দে। নির্দেশনা গার্গী ভট্টাচার্য। দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চস্থ হবে ব্রেখটের নাটক অবলম্বনে মধ্যমগ্রামের ‘নটমন’ প্রযোজিত নাটক ‘আলুভাজা, চকলেট অথবা অন্যকিছু’। ভাষান্তর ও নির্দেশনা তমাল সেন। চতুর্থ দিনের প্রথম নাটক সোদপুরের নাট্যদল ‘ঘোলা কালমুকুর’- এর ‘রাত ভোর বৃষ্টি’। দীপ ও গুঞ্জনের যৌথ উদ্যোগে লেখা ওই নাটকের নির্দেশকও তাঁরা দু’ জনে।
ওই দিনের দ্বিতীয় নাটক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা’। ‘নাট্যম বলাকা’র ওই প্রযোজনার নির্দেশক তরুণ চৌবে। সমাপ্তি সন্ধ্যার প্রথম নাটক দক্ষিণ ২৪ পরগনার ‘রোদ্দুর’-এর প্রযোজনা ‘বাঁচাও’। নাটক ও নির্দেশনা শুভাশিস খামারু। কলকাতার ‘অন্তর্মুখ’ প্রযোজিত ‘কার কপালে’ মঞ্চায়নের মাধ্যমে যবনিকা পড়বে এ বছরের ‘নাট্যদর্শন’- এর। ‘কার কপালে’র লেখক ও নির্দেশক সৌমিত্র বসু। সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যেও দাদা ঠাকুর (শরৎচন্দ্র পণ্ডিত)-এর শহর রঘুনাথগঞ্জ পিছিয়ে নেই যুবনাশ্ব (মণীশ ঘটক)- এর শহর বহরমপুরের থেকে এক কদমও। ১৮৯৯ সালে বহরমপুর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশের প্রথম নাট্য আকাদেমি— ‘দ্যা কাশিমবাজার স্কুল অব ড্রামা’। দেশের প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৩ সালে রঘুনাথগঞ্জে। ফলে নাট্যচর্চাতেও বহরমপুরের সঙ্গে রঘুনাথগঞ্জের ‘টক্কর’ লড়া স্বাভাবিক বইকি!