ধবলগিরির নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বসন্ত সিংহরায়কে ফিরিয়ে এনেছিলেন যিনি, সেই শেরপা দাওয়া ওয়াংচুক কাঞ্চনজঙ্ঘায় তুষার ধসে ছন্দা গায়েনের সঙ্গে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। এই বিপর্যয়ের দিনে তাঁর সদা হাসিখুশি মুখটাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে অসামরিক ক্ষেত্রে প্রথম ভারতীয় হিসাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ জয়ী বসন্ত সিংহরায়ের। মনে পড়ে যাচ্ছে কী ভাবে একদিন নিজের জীবন বিপন্ন করেও জীবিত অবস্থায় তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিলেন ওয়াংচুক।
২০১০ সালের ১৭ মে প্রথম বাঙালি হিসাবে এভারেস্ট জয় করার ঠিক এক বছর পরেই ২০১১ সালের ২০ মে প্রথম ভারতীয় হিসাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা জয় করেন কৃষ্ণনগরের ‘ম্যাক’-এর দুই সদস্য, বসন্ত সিংহরায় ও দেবাশিস বিশ্বাস। সে বার কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানেও শেরপা হিসাবে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত বসন্তবাবুদের সঙ্গী ছিলেন এই দাওয়া ওয়াংচুক। এছাড়াও বসন্তবাবুদের অন্নপূর্ণা-১ অভিযানেও সঙ্গী ছিলেন তিনি। গত বছর ধবলগিরি অভিযানেও শেরপা হিসাবে ম্যকের সদস্যদের সঙ্গী হয়েছিলেন ওয়াংচুক। এই অভিযানেই বিপদের মধ্যে পড়ে যান বসন্তবাবুরা। এই অভিযানে মলয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৃতীয় ক্যাম্পে থেকে গিয়েছিলেন দাওয়া ওয়াংচুক। দেবাশিস বিশ্বাস ও বসন্ত সিংহরায়ের সঙ্গে শৃঙ্গ জয়ের উদ্দেশে এগিয়ে যান পেমবা ও পাসাং শেরপা। কিন্তু শৃঙ্গ থেকে প্রায় ২০০ ফুট নীচে চোখের সামনে এক স্প্যানিশ অভিযাত্রীকে পিছলে গভীর খাদে পড়ে যেতে দেখে আর না এগিয়ে নিচে নেমে আসার সিদ্ধান্ত নেন বসন্তবাবুরা। নেমে আসার সময় অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। পেমবা শেরপার সঙ্গে নিচে নেমে আসেন দেবাশিস বিশ্বাস। আশ্রয় নেন জাপানি মহিলাদের এক শিবিরে। অক্সিজেনের অভাবে অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েন বসন্ত সিংহরায়। রাতে তাঁর সঙ্গে থাকা পাসাং শেরপা একটু নিচে নেমে এসে পাথরের আড়াল খুঁজে নিয়ে প্রাণ বাঁচান। প্রায় আট হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকেন বসন্তবাবু। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখান থেকে বসন্তবাবুকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন দাওয়া ওয়াংচুক। বসন্তবাবু বলেন, “পরের দিন দুপুরে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে হাজির হয় ওয়াংচুক। আমাকে সেই সিলিন্ডারটা দিয়ে দেয়। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনও অক্সিজেন ছাড়াই আমাকে নিয়ে নীচে নামতে থাকে ও।” বসন্তবাবু বলেন, “তখন আমার শরীরে এতটুকু শক্তি ছিল না। সেই অবস্থায় আমাকে নিচে নামানো প্রচণ্ড কঠিন কাজ ছিল। কখনও বা দড়ির সাহায্যে খাড়াই পথে নামা, কখনও বা প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও পিঠে করে, কখনও আবার টানতে টানতে আমাকে নীচে নামিয়েছিল।”
আজ সেই ওয়াংচুকই নিখোঁজ, এটা মানতে পারছেন না বসন্তবাবু। তিনি বলছেন, “আমরা চাইছি একটা মিরাক্যাল ঘটুক। ছন্দার সঙ্গে ফিরে আসুক সকলে। সেই হাসি-হাসি মুখ নিয়ে আবার আমার সামনে এসে দাঁড়াক ওয়াংচুক।” তবে সেই সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে মনে করছেন দিচ্ছেন নিজেই। কিন্তু তিনি তো বেঁচে ফিরে এসেছেন। বসন্তবাবু বলছেন, “আমি পড়েছিলাম ফাঁকা জায়গায়। কিন্তু ছন্দারা তুষার ধসে হারিয়ে গিয়েছে। সেটা অনেক বেশি বিপজ্জনক।”