OBC Reservation

ওবিসি সংরক্ষণ হ্রাসে নয়া জটিলতার মেঘ

প্রশ্ন উঠছে, কমিশনের মাধ্যমে আবেদন যাচাই করে নতুন ওবিসি তালিকা তৈরির যে সংস্থান নতুন বিলেই রয়েছে, তার জন্য সময় না-দিয়ে আগেই সংরক্ষণের পরিধি ছোট করে আনা হল কেন?

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ ০৬:২৫
Share:

—প্রতীকী চিত্র।

এক গেরো কাটাতে গিয়ে আর এক গেরো! জাতি সমীক্ষা করে সামাজিক ন্যায়ের অধিকার প্রসারিত করার দাবি যখন দেশ জুড়ে, সেই সময়েই অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য সংরক্ষণের পরিধি এক ধাক্কায় ১০% কমে গিয়েছে এই রাজ্যে। বিধানসভায় নতুন সংশোধনী বিল পাশ হওয়ার পরে ওবিসি কোটায় কর্মরতদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তার আশঙ্কা করেছে বিরোধীরা।

তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় বিস্তর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওবিসি শংসাপত্র বাতিল করেছিল আদালত, সংরক্ষণের বিষয়টিও বিধি মেনে করার কথা বলেছিল। রাজ্যে ক্ষমতায় এসে আদালতের সেই নির্দেশকে সামনে রেখেই ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনে সংশোধনী এনেছে বিজেপি সরকার। একই সঙ্গে আরও একটি সংশোধনী বিল এনে অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের কাজের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। বিধানসভায় সদ্য পেশ ও পাশ হয়ে যাওয়া বিল অনুযায়ী, নাগরিকদের আবেদন যাচাই করে কমিশন ওবিসি শ্রেণি সংক্রান্ত সুপারিশ করবে সরকারের কাছে। কমিশন ও সরকারের সমন্বয়ের ভিত্তিতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ওবিসি সংরক্ষণের শতাংশ নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু কমিশন সেই কাজ শুরু করার আগেই আপাতত ওবিসি সংরক্ষণ আগেকার ১৭% থেকে কমিয়ে আনা হয়েছে ৭%-এ। ওবিসি তালিকায় থাকা ১১৩টি জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে ৬৬টি (যার মধ্যে ৫৪টি হিন্দু এবং ১২টি মুসলিম) রেখে দেওয়া হয়েছে। সরকারি পদে সংরক্ষণ কার্যকর করতে যে ‘১০০ পয়েন্ট রস্টার’ ছিল, তা-ও বাতিল করে শ্রম দফতরকে নতুন করে রস্টার তৈরি করতে বলা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, কমিশনের মাধ্যমে আবেদন যাচাই করে নতুন ওবিসি তালিকা তৈরির যে সংস্থান নতুন বিলেই রয়েছে, তার জন্য সময় না-দিয়ে আগেই সংরক্ষণের পরিধি ছোট করে আনা হল কেন? যে সব জনগোষ্ঠী সংরক্ষণের আওতার বাইরে গেল, তাদের মধ্যে থেকে কর্মরতদের ভবিষ্যৎ কী হবে? বিলের ব্যাখ্যায় অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ অবশ্য বলেছেন, ‘‘কমিশনকে পাশ কাটিয়ে তৃণমূলের সরকার তাদের তোযণ নীতির জন্য মর্জিমতো ওবিসি তালিকা করেছিল। আদালত তাদের সিদ্ধান্ত খারিজ করে রায় দিয়েছিল। আমরা সেই নির্দেশকে সম্মান জানিয়ে সংশোধনী বিল এনেছি। এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। কমিশনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে আবার ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থাকছে।’’ বিরোধীদের প্রশ্ন, এখন তালিকা বাদ (যার মধ্যে ৭৭টি মুসলিম জনগোষ্ঠী) দেওয়ার সময়ে সমীক্ষা কোথায়? মন্ত্রী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘‘যখন সমীক্ষা ছাড়া ইচ্ছামতো তালিকা হয়েছিল, তখন বিরোধীরা (তৃণমূল) ট্রেজ়ারি বেঞ্চে ছিলেন। তখন কিছু বলেছিলেন?’’

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সূত্র মনে করিয়ে দিচ্ছে, বাম জমানায় ১৯৯৩ সালে অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন গড়তে আইন এনেছিল জ্যোতি বসুর সরকার। তার পরে ১৯৯৪ সালে চালু হয়েছিল ৫% ওবিসি সংরক্ষণ, যা পরবর্তী কালে ৭% হয়েছিল। রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশ আসার পরে ২০১০ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার অতি অনগ্রসরদের জন্য ১০% এবং অনগ্রসরদের জন্য ৭% (সব মিলে ১৭%) সংরক্ষণ কার্যকর করে। তৃণমূলের সরকার এসে দুই শ্রেণিতেই নতুন তালিকা যোগ করেছিল, যা বাতিল হয়েছে। এখন শুভেন্দু অধিকারীর সরকার আবার বসু-জমানার ৬৬টি জনগোষ্ঠীর তালিকায় ফেরত গিয়েছে!

এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের বাবর আলি, আইএসএফের নওসাদ সিদ্দিকী, সিপিএমের মোস্তাফিজুর রহমানেরা। প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অমিতাভ চক্রবর্তীর মতে, ‘‘একই আর্থ-সামাজিক অবস্থানে হিন্দু ও মুসলিম, উভয় শ্রেণির মানুষই থাকলে এক অংশ ওবিসি সংরক্ষণ পাবে আর অন্য অংশ পাবে না— এটা সরকারের নীতি হতে পারে না। জনগণনা এবং জাতি-সমীক্ষা সম্পূর্ণ হলে এই কাজ করা যেত।’’ সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘সমীক্ষা ছাড়া তৃণমূলের সরকার যে গোলমাল পাকিয়েছিল, তা নিয়ে আদালতই স্পষ্ট বক্তব্য জানিয়েছে। এর পরে সুষ্ঠু পদক্ষেপ না-করে ওবিসি-প্রশ্নে জটিলতা বাড়িয়ে দেওয়া হল।’’ আর নওসাদের বক্তব্য, ‘‘আর্থ-সামাজিক অবস্থান যাচাই করে ধর্মীয় পরিচিতি নির্বিশেষে সংরক্ষণ দেওয়া হোক। কিন্তু এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একটা সম্প্রদায়কে নিশানা করা হচ্ছে।’’

যদিও মন্ত্রীর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘একটা সম্প্রদায়কে বেছে নিয়েই যখন সুবিধা দেওয়া হচ্ছিল, তখন কী হচ্ছিল?’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন