‘অ্যাডভেঞ্চারের’ স্বাদ নিতে স্কুলের ‘ল্যাবরেটরি রুমে’ বন্ধুর জন্মদিন পালন করতে সারা রাত কাটাল সপ্তম শ্রেণির তিন ছাত্রী। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ কোচবিহারের রামপুরের জোড়াই হাইস্কুলের ওই ছাত্রীদের উদ্ধার করা হয়। স্কুল সূত্রের খবর, ছাত্রীরা সুস্থ রয়েছে। অভিভাবকদের ডেকে তাঁদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ছাত্রীরা স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, এক বন্ধুর জন্মদিন পালন করতেই তাঁরা চুপিসাড়ে স্কুলের ল্যাবরেটরি রুমে যায়। স্কুল বন্ধ করে সবাই চলে গেলে পূর্ব পরিকল্পনা মতো রাতটা স্কুলে কাটিয়ে পর দিন ক্লাস করে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। সে ক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তালা বন্ধ করার আগে কেন ভাল করে সব ঘর দেখে নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকদের অনেকেই।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভবেশ রায় বলেন, “ওই তিন ছাত্রীর মধ্যে এক জনের জন্মদিন ছিল। তা উদযাপন করতেই তারা ওই ঘরে যায়। দ্বিতীয় তলায় ল্যাবরেটরি ঘর। সেখানে কোনও ক্লাস ছিল না। ছুটির আগে প্রথম তলাতেই সব ক্লাস হয়। সে সব ঘর দেখার পরেই দায়িত্বে থাকা কর্মী তালা দেন। ওরা এখন সুস্থ রয়েছে।” ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষের কোনও গাফিলতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন কোচবিহার জেলা স্কুল পরিদর্শক বালিকা গোলে। তিনি বলেন, “আমি প্রধানশিক্ষকের সঙ্গে এক দফা কথা বলেছি। পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখার পরেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার বিধায়ক অর্ঘ্য রায় প্রধান। তিনি বলেন, “ঠিক কী হয়েছে তা এখনও জানি না। তবে কারও গাফিলতি থাকলে মেনে নেওয়া হবে না।”
স্কুলে ঠাণ্ডা প্রকৃতির মেয়ে বলেই পরিচিত ওই তিন ছাত্রী। ঠিক কী হয়েছিল ওই দিন?
স্কুল ও পরিবার সূত্রে খবর, প্রতি দিনের মতো তারা তিন বন্ধু বুধবার স্কুলে যায়। টিফিন পিরিয়ডে তাঁরা তিন জনই স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়ে। এদের মধ্যে এক ছাত্রীর বাড়ি স্কুলের কাছে ভলকা এলাকায়। তার বাড়িতে গিয়ে তারা খাওয়াদাওয়া সারে। বাকি দুই ছাত্রীর এক জন মধ্য রামপুরের বাসিন্দা। অভিভাভবকদের তারা জানায় ওই ছাত্রীর ভাইয়ের সে দিন জন্মদিন। সেখানেই তারা সবাই যাবে। রাতে ওখানেই থাকবে। সকালে বাড়ি ফিরে আসবে। বাড়ির লোক তেমনই বিশ্বাস করেন। কিন্তু তারা সেখানে না গিয়ে ফের স্কুলে ফিরে যায়।
স্কুলের এক শিক্ষক জানান, সকালে ওই তিন ছাত্রী জানিয়েছে, স্কুল ছুটির পরে সবাই যখন সামনের সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। তখন তারা পিছনের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে ল্যাবরেটরি ঘরে ঢুকে যায়। তারা কেক, কিছু খাবার এবং জামাকাপড়ও নিয়ে যায়। ল্যাবরেটরি ঘরের বাইরে তালা লাগানো ছিল না। ফলে সকালে তারা নীচের তলায় নামলে স্থানীয় এক বাসিন্দা তাদের স্কুলের ভিতরে দেখে হইচই শুরু করেন। পরে বাসিন্দারা সেখানে পৌঁছে ছাত্রীদের উদ্ধার করেন। এক ছাত্রীর বাবা বলেন, “মেয়ের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তাদেরই এক বান্ধবী তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে সেখানে রাতে থাকার পরামর্শ দেয়। সে জন্যই সে বাড়িতে মিথ্যে বলে টাকা ও জামা নিয়ে যায়। এ ভাবে কেন জন্মদিন পালন করতে গেল বুঝতে পারছি না। যে কোনও সময় বিপদ হয়ে যেতে পারত।’’
বাসিন্দাদেরও অনেকে জানান, ওই রাতে প্রচুর বৃষ্টি এবং ঝড়ো হাওয়া বয়েছে এলাকা জুড়ে। বেশ কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎও ছিল না। ওই সময় বাড়িতেও অনেকে ভয়ে কাটিয়েছেন। সেখানে ছাত্রীদের কোনও বিপদ হলে চিৎকার করলেও শুনতে পেতেন না কেউ। তৃণমূলের জোড়াই অঞ্চল সভাপতি অনিল বিশ্বাস বলেন, “আমার বাড়ির পাশেই এক ছাত্রীর বাড়ি। আমরা তো সকালে ওই কথা শুনে সবাই ভয় পেয়ে যাই। ভাগ্য ভাল রাতে ওদের কোনও বিপদ হয়নি।” জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের মনোচিকিৎসক স্বস্তিশোভন চৌধুরী বলেন, “নিছক আনন্দ পেতে পারিবারিক অনুশাসন ভাঙার প্রবণতা দেখা যায় অনেকের মধ্যে। আবার স্বভাবজাত কারণেও অনেকের মধ্যে বড়রা যা বলে তা না মানার প্রবণতা দেখা যায়। তা থেকে এমন চিন্তা আসতে পারে।”