সম্প্রতি বিমান বসু ও ওমপ্রকাশ সিংহের সঙ্গে প্রচারে জলপাইগুড়ির কংগ্রেস নেতারা।
রাজবাড়ি পুকুর থেকে আসা শেষ বসন্তের হাওয়ায় লাল পতাকা ঝাপটে পড়ছে তেরঙ্গা ঝান্ডায়। রোদ ঝলমলে সকালে লাল মোরাম বিছানো রাস্তা দিয়ে চলেছে মিছিল। রায়কতপাড়ার অলিগলি ঘুরে শেষ হল মিছিল। ‘‘চা খাবেন তো?’’ শহর ব্লক কংগ্রেস সভাপতি পিনাকী সেনগুপ্তের কাছে জিজ্ঞাসা জলপাইগুড়ি পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সিপিএম কাউন্সিলর দুর্বা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সকাল হোক বা গভীর রাত, পিনাকীবাবুর অবশ্য চায়ে আপত্তি নেই।
শহরের থানা মোড়ে কংগ্রেস অফিসের ভিতর থেকে সামনের চায়ের দোকানের পাশেই দিনের বেশি সময় কাটে পিনাকীবাবুর। থানা মোড়ে চায়ের দোকানের পাশে পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান পিনাকীবাবুকে ঘিরে ভিড়ের চিত্র বছরখানেক আগেও নিয়মিত ছিল। গত লোকসভা ভোটের পরে ছবিটা কিছুটা পাল্টে গিয়েছিল। প্রাক্তন জেলা কংগ্রেস সভাপতি মোহন বসু দলবল নিয়ে তৃণমূলে যোগ দেন। পুরসভায় কংগ্রেসের বোর্ড ভেঙে যায়। বেশ কিছু ওয়ার্ডে কমিটি সমেত কংগ্রেস কর্মীরা তৃণমূলে চলে যান। গত বছরের পুরসভা ভোটে ২৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে কংগ্রেস পায় মাত্র ৫টি। থানা মোড়ের কংগ্রেস অফিসের সামনে ভিড় পাতলা হয়। জটলা থেকে হঠাৎই একা হয়ে যান পিনাকীবাবুরা। বিধানসভা ভোটে জলপাইগুড়ির সব বুথে এজেন্ট দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল কর্মীদের মনে। তবে এখন কংগ্রেসকর্মীদের ভরসা জুগিয়েছে জোট। প্রতিদিন বিকেলে পিনাকীবাবুদের চায়ের আড্ডায় জুটেছেন বামপন্থী কর্মীরাও।
সপ্তাহখানেক ধরে জলপাইগুড়িতে যৌথ প্রচার শুরু হয়েছে। ঠিক হয়েছে, কোথাও কংগ্রেস বা বামেরা পৃথক কোনও প্রচার চালাবেন না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া থেকে পদযাত্রা, পথসভা— সবেতেই কাস্তে হাতুড়ি এবং হাত চিহ্নের পতাকা থাকবে। শহরের ডিবিসি রোডে যৌথ অফিসও খোলা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই প্রচারে সমন্বয় বাড়াতে বৈঠকে বসছেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি নির্মল ঘোষদস্তিদার এবং সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য জিতেন দাস। দিন তিনেক আগে জলপাইগুড়ির রাস্তায় মিছিলে এক সঙ্গে হেঁটেছেন কংগ্রেস প্রার্থী সুখবিলাস বর্মা, কংগ্রেস নেতা ওমপ্রকাশ মিশ্র এবং সিপিএম নেতা বিমান বসু।
জেলা সিপিএম কার্যালয় সুবোধ সেন ভবনের পাশের একটি বাড়ির নীচেও খুলেছে জোটের অফিস। ডিওয়াইএফের জেলা কমিটির সদস্য দীপশুভ্র সান্যালের কথায়, ‘‘দুই দলের সব স্তরে কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতেই যৌথ প্রচারের আয়োজন হয়েছে। তাতে ফলও মিলছে।’’
কদমতলা লাগোয়া ওই জোটের অফিসে গত শনিবার ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ডার্বি ম্যাচ দেখতেও কংগ্রেস কাউন্সিলরদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ডিওয়াইএফের কর্মীরা। তাঁদের আসল লক্ষ্য অবশ্য আগামী ১৭ এপ্রিলের ভোট-ডার্বি। সেই ম্যাচে দুই দলের ভোট যদি এক বাক্সে আসতে পারে, তা হলেই বাজিমাত— মনে করছেন দু’দলের সমর্থকরাই। গত লোকসভা ভোটের ফলে জলপাইগুড়ি বিধানসভায় তৃণমূলের থেকে বামেরা হাজার চারেক ভোটে এগিয়ে। কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট ছিল চব্বিশ হাজারের কিছু বেশি। অঙ্কের সহজ হিসেবে দুই দলের মোট ভোট তৃণমূলের থেকে প্রায় ২৯ হাজার বেশি। লোকসভার পরে কংগ্রেসের শক্তিক্ষয় হলেও ব্যবধানের বহর মানসিক ভাবে জোটপন্থীদের এগিয়ে রেখেছে। সে অঙ্কেই উজ্জীবিত সুখবিলাস বর্মা প্রচারে গিয়ে গানও ধরেছেন। বলছেন, ‘‘গলা ছেড়ে গাইছি। এত দিন কংগ্রেসিদের ভালবাসা পেয়েছি। এখনও বামপন্থীরাও গানের সুরে গলা মিলিয়েছেন। তাই নিশ্চিন্তে গাইছি।’’
গত রবিবার দোতারায় নতুন তার বেঁধেছেন সুখবিলাসবাবু। থানা মোড়ের চায়ের দোকানে ফিরে এসেছে বিকেলের ভিড়ও।