কাবুলের রাস্তায় মহিলাদের বিক্ষোভ। ছবি- টুইটারের সৌজন্যে।
পুরাণের পাঁচ কন্যার মতো আধুনিক কন্যারাও বুঝিয়ে দিতে চান পাঁচ ইন্দ্রিয়ের শক্তিকে। আজ দৃষ্টি
অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ‘চোখের সামনে’ থাকা জরুরি। ‘ভার্চুয়াল’ সমাজ ব্যবস্থায় এমনটাই দস্তুর। রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত এই সমান্তরাল সমাজব্যবস্থার নিয়ম-কানুন এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। এই যখন পরিস্থিতি, তখন আমেরিকার একটি অনুষ্ঠান মঞ্চে সেরা টিভি-সিরিজ় চিত্রনাট্যের পুরস্কার হাতে ব্রিটিশ কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী-লেখিকা মাইকেলা কোল বললেন— ‘‘সমাজমাধ্যমের এই যুগে রোজ আমরা অন্যের চোখ দিয়ে নিজেদের অনুভূতির বিচার করে চলেছি। অন্যের দৃষ্টির মাপকাঠিতে সাফল্য বিশ্লেষণ করে চলেছি নিজেদের। তার চেয়ে অদৃশ্য থাকো।’’
কেবল দু’চোখের মায়ায় নিজেকে না জড়িয়ে যেন তৃতীয় নয়ন খুলে নিজের ভিতরে চাইতে বলছেন তিনি। নিজের ভিতরে যে অজানা সাফল্যের চাবিকাঠি আছে, তবেই তার হদিশ মিলবে হয়তো বা।
কিন্তু শুধুই কি ভার্চুয়াল মাধ্যমের নজরদারি থেকে অদৃশ্য থাকা জরুরি?
বাস্তবের সামাজিক চোখও তো পুরুষতন্ত্রের রশি নিয়ে প্রত্যেক কোণায় প্রতিনিয়ত সদাজাগ্রত। তালিবানি রাষ্ট্র ঠিক করছে, মেয়েরা ঘরের বাইরে কতটুকু বেরোতে পারেন, পড়াশোনা আদৌ কি করতে পারেন, কতটুকু চেহারা প্রকাশ্যে রাখতে পারেন। নেটিজেনরা ঠিক করছেন নুসরতের চরিত্র তাঁর সন্তানের বাবার পরিচয়ের উপরে নির্ভর করবে কি না। রোজ শুধু চোখের ‘খিদে’ না মিটিয়ে, একদিন ঘরে একা পেয়ে মালদহের কোনও এক গ্রামে বৃদ্ধ পড়শি ঠিক করছেন, বারো বছরের কিশোরীটিকে আজই ধর্ষণ করে নেওয়া ‘উচিত’ হবে।
পুরুষশাসিত সমাজ নিজেদের জমিতে মেয়েদের দেখতে পেলেই তাকে অনুপ্রবেশ বলে মনে করে। এবং মনে করে, পুরুষের চোখে নিজের মানদণ্ড ঠিক রাখার দায় মেয়েদেরই।
অতসী ফুলের চেয়েও সুন্দর পদ্মের মতো রমণীয় এমনই এক মেয়েকে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখে চোখ কপালে উঠেছিল দৈত্যকুলের। তারাও সালিশি করে বলেছিল, ‘‘মহিষাসুর সনে তুমি কর পতিভাব।/ দূরেতে যাইবে তোমার মনের সন্তাপ।।’’ ভবানীপ্রসাদের দুর্গামঙ্গল কাব্যে মহিষাসুর নিজেও সেই রণরঙ্গিণীকে উপদেশ দিয়ে বলে, বাঁচতে চাইলে তাকে বরমাল্য পরিয়ে ভজনা করতে হবে। সে মেয়ে অবশ্য পৌরুষের ওই গর্বকারীকে উচিত শিক্ষাই দেয়।
কিন্তু এই তথাকথিত বীরের ভজনা করার পথ কি এখনও বদলেছে? না হলে লোকচক্ষুর হাত থেকে বাঁচতে আজও কেন মেয়ের ‘মর্যাদা’ রক্ষায় গণধর্ষণের পরে ধর্ষকের সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেওয়া শ্রেয় মনে করেন খোদ মা-বাবা? আর, পরিবার-সমাজের নজরদারির পাহাড়প্রমাণ চাপে রণহুঙ্কার দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো হয় না মেয়েটির। তখন হেরে যান পুরাণের দুর্গা।
তবে কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য থাকে। তাই দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে ঠিক এমনই ঘটনায় উপযুক্ত পদক্ষেপ করে অবশেষে মেয়েকে বাঁচিয়ে দেয় আদালত।
দেবী ভাগবতে বর্ণিত আছে, দুর্গমাসুরের হাত থেকে দেব-দ্বিজদের রক্ষা করতে শতনেত্রযুক্ত মুখমণ্ডল, সুনীলকান্তি, চতুর্ভুজারূপে আবির্ভূত হন দেবী। তাঁর করুণাঘন চোখের জলে খরা থেকে বেঁচে প্রাণ ফিরে পায় জগৎসংসার। এতেই রুষ্ট হয়ে দেবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন দুর্গম। তাঁকে বধ করে দেবী দুর্গা রূপে প্রকাশমানা হলেন। সেই অগ্নিবর্ণা দেবীই আবার অগ্নিলোচনা হয়ে অন্য কল্পে বধ করেন মহিষাসুরকে।
অন্তরের তেজ থেকে জাগিয়ে তোলা এই দৃষ্টিকে খোঁজার কথা হয়তো বলেছেন মাইকেলাও। পুরস্কারজয়ী টিভি-সিরিজ়টিতে নিজের যৌননিগ্রহের অভিজ্ঞতার কাহিনিই বলেন তিনি। এবং দেখান, বাইরের দৃষ্টির বাঁধন থেকে নিজেকে সরিয়েও বৈদ্যুতিন মাধ্যমের মঞ্চটিকে কত সুন্দর ব্যবহার করা যায়।
এখানেই মুন্সিয়ানা, নিজের চারদিকে ঘিরে থাকা দৃষ্টির বাঁধনটি কেটে নিজের তৃতীয় নয়নকে জাগিয়ে তোলার।