আলিপুরদুয়ারের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন। — নিজস্ব চিত্র।
টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারের বহু এলাকায়। শনিবার রাত থেকে ক্রমাগত বৃষ্টিতে ফুঁসছে তিস্তা, তোর্সা, রায়ডাক-সহ বেশ কয়েকটি নদী। ভুটান পাহাড়ে লাগাতার বৃষ্টির কারণে কয়েকটি নদীতে জল বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। সে কারণে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ভুটান সীমান্ত লাগোয়া হাসিমারা, কালচিনি এলাকায়। শিলিগুড়ি থেকে মিরিকগামী রাস্তায় ধস নেমে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কোচবিহারের হরিপুরে জলের নীচে অন্তত ৫০টি বাড়ি। প্রশাসনের তরফে মাইকিং করে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতর বলছে, দুর্যোগ আপাতত থামছে না উত্তরবঙ্গে। পাঁচ জেলায় অতি প্রবল বর্ষণের জন্য লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তাতেই কপালে ভাঁজ পড়েছে প্রশাসনের।
গত কয়েক দিন ধরে ঝড়বৃষ্টি চলছে উত্তরবঙ্গে। শনিবার রাত থেকে আবার প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে পাহাড়-সহ সমতলের জেলাগুলিতে। তার জেরে তিস্তা, তোর্সা, মহানন্দা, লিস, ঘিস, রায়ডাক, সঙ্কোশ, জলঢাকা নদীগুলি ফুঁসছে। সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে আলিপুরদুয়ারের জয়গাঁ এলাকা৷ ভারত-ভুটান সীমান্ত লাগোয়া ওই এলাকায় বানভাসি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷ ভুটানের ফুন্টশিলিং গেটের একাংশ জলমগ্ন। সীমান্ত লাগোয়া হাসিমারা, জয়গাঁ, কালচিনি, হ্যামিল্টনগঞ্জ এবং বানারহাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷ সেখানে বাড়ি-ঘর এখন জলের নীচে৷
কোচবিহারে ফুঁসছে নদী। — নিজস্ব চিত্র।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে শনিবার থেকেই মাইকিং করে এলাকাবাসীদের সতর্ক করা হয়েছে। অন্য দিকে, তিস্তা, তোর্সা, মহানন্দা, রায়ডাক, সঙ্কোশ, জলঢাকা নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সুরক্ষিত জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভুটানের পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীর জলে উত্তরের আলিপুরদুয়ারের একাংশ এখন জলমগ্ন। অন্য দিকে, একই অবস্থা ভুটানের ফুন্টশিলিং লাগোয়া অঞ্চলে৷ বন্ধ রয়েছে ফালাকাট-আলিপুরদুয়ার সড়ক। চরতোর্ষা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পেয়ে ওই সড়কের একাংশ ভেঙে গিয়েছে। তাতেই বিপত্তি।
জলমগ্ন কোচবিহারের হরিপুর এলাকা। — নিজস্ব চিত্র।
শনিবার রাতের ভারী বৃষ্টিতে দার্জিলিং থেকে মিরিকগামী রাস্তায় ধস নেমেছে। পাহাড় থেকে পাথরের চাঁই নেমে ভেঙে গিয়েছে রাস্তা। সে কারণে রবিবার সকাল থেকে যান চলাচল একপ্রকার বন্ধ। পাথরের চাঁই সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে এখন অনেকটাই সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্য দিকে, উত্তর সিকিমের ডুংজু এলাকায় তিস্তার জল বৃদ্ধি পেয়ে বেলি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিখোলা এবং ফিদাংয়ের মাঝখানের এলাকায় যোগাযোগ সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ হয়েছে। যে ভাবে জল বেড়ে চলেছে তিস্তা, তোর্সা, মহানন্দা, রায়ডাক, সঙ্কোশে। তাতে বাসিন্দাদের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ধস নেমেছে রাস্তায়। — নিজস্ব চিত্র।
তোর্সা নদীতে জলস্তর বৃদ্ধির কারণে কোচবিহার জেলার মধুপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের হরিপুর এলাকায় জল জমেছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বেশ কিছু বাড়িতে জল ঢুকেছে। রবিবার সকালে ওই এলাকা পরিদর্শনে যান কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক সুকুমার রায়। জলমগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের ত্রিপল, ত্রাণ বিতরণ করেন তিনি।
শিলিগুড়ি-মিরিক সড়কে ধস সরানোর কাজ চলছে। — নিজস্ব চিত্র।
রবিবার সকালে কোচবিহারে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও আকাশ মেঘলা। হরিপুর এলাকার বাসিন্দা মজিরুল মিয়া বলেন, ‘‘নদীর তীরবর্তী এলাকার প্রায় ৫০টি বাড়ি জলের নীচে। কোথায় যাব, কী করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’’ কোচবিহারে তোর্সা নদী সংলগ্ন ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জগাই দার বলেন, ‘‘এর পর যদি আরও বৃষ্টি হয়, তা হলে আমাদের অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে।’’
কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক সুকুমার বলেন, ‘‘কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের মধুপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা দিয়ে তোর্সা নদী বয়ে গিয়েছে। শনিবার রাত থেকে তোর্সা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এলাকার বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। সেই পরিস্থিতি দেখতেই এলাকা পরিদর্শনে এসেছি। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এই মানুষগুলির থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা কী করা যায়, তা দেখা হচ্ছে।’’
উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলায় অতি প্রবল বর্ষণের লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে সোমবার। ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার বা তারও বেশি বৃষ্টি হতে পারে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে। মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টি সামান্য কমতে পারে। তবে দুর্যোগে বিরাম নেই। আগামী শনিবার পর্যন্ত এই পাঁচ জেলায় ভারী বৃষ্টি চলবে বলে জানিয়েছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। সঙ্গে বইতে পারে ঝোড়ো হাওয়া। উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহেও আগামী কয়েক দিনে বিক্ষিপ্ত ভাবে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ভাবে বৃষ্টি চললে নদীগুলিতে জলস্তর আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা। সে ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হতে পারে।