জলে একসময় স্রোত ছিল, ঝোরার কাছে গেলেই জল-পাথরে ঠোকাঠুকির শব্দ শোনা যেত। সেই ঝোরায় আর জলের দেখা মেলে না। খুব বৃষ্টির সময়ে কিছুটা জল আচমকা চলে যায়। তার পর সেই এক অবস্থা। সে দিনের স্মৃতির ঝোরার বুকে এখন শহরের জঞ্জাল, প্লাস্টিক, আবর্জনার স্তুপ। স্রোতের শব্দের বদলে শুধুই দুর্গন্ধ। মালবাজার পুর এলাকার ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে চলে যাওয়া বেহাল পাগলাঝোরার চেহারা ফেরাতে দাবি তুলছেন শহরবাসী।
মালবাজারের উত্তর দিকে গুরজংঝোরা আর রাজা চা বাগান হয়ে এই ঝোরা শহরে ঢোকে। ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভেতর দিয়ে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক টপকে ৪, ৫, ৮ নম্বর ওয়ার্ড হয়ে পাগলাঝোরার গতিপথ। গতিপথটাই শুধু এখন যা আছে, ঝোরার জল সবটাই অতীত। অভিযোগ, পুরসভার ঔদাসীন্য আর মাত্রাতিরিক্ত দূষণে আস্ত একটা ঝোরাই হারিয়ে গিয়েছে মালবাজার শহর থেকে।
ঝোরাকে দূষণ মুক্ত করে আবার পুরনো চেহারায় ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন অনেক শহরবাসীই। কিন্তু পুরসভার অন্তত কুড়িটিরও বেশি বড় নিকাশির মুখ পাগলাঝোরার দিকে রয়েছে। পুর এলাকার বর্জ্য ঝোরাতেই পড়তে থাকায় পাগলাঝোরা আগের চেহারায় আদৌ ফিরবে কিনা তা নিয়েই সংশয়ে বাসিন্দারা।
মালবাজারের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাঘাযতীন কলোনিতে পাগলাঝোরার খুব কাছেই থাকেন রেণুবালা দে। আশি ছুঁই ছুঁই রেণুবালাদেবী এখনও ঝোরার কুলকুল ধ্বনি করে জল বয়ে যাওয়ার স্মৃতি মনে করতে পারেন। তাঁর কথায়, ‘‘বর্ষায় আতঙ্কে থাকতাম। কখন ঝোরায় জল বাড়ত তা ঠাহর করা যেত না। একেক বার তো জল পাড়ায় ঢুকে যেত। এখন সেই ঝোরা মরার মতো পড়ে আছে। আশির দশকে এই ঝোরাই একসময় কাঠের সেতু উড়িয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল।’’ মালবাজারের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নেতাজী কলোনির বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পাল বলেন, ‘‘কাঠের সেতু জলের তোড়ে উড়ে যাওয়ার সময় আমরা খুব ছোট ছিলাম। ঝোরার জলে অনেক মাছও ধরেছি। কিন্তু আজ সবই স্মৃতি।’’
ঝোরাকে নিয়ে চিন্তিত মালবাজার পুরসভার চেয়ারম্যান স্বপন সাহাও। স্বপন বাবু বলেন, ‘‘শহরের উত্তরপ্রান্তের বেশ কিছু চা বাগানের মধ্যে দিয়ে ঝোরাটি বয়ে আসে। বাগানে অনিয়ন্ত্রিত সেচ কাজের জন্য ঝোরার জল আটকে গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পাগলাঝোরার ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। বাগানগুলোকে জানিয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি।’’ তবে ঝোরাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে একটা অ্যাকশন প্ল্যানের কথা ভাবা হয়েছে বলে স্বপনবাবু জানান। গত পাঁচ বছর ধরে মালবাজার শহরে শুকনো মরসুমে জলকষ্ট চরমে উঠছে। পাগলাঝোরা প্রাণ ফিরে পেলে সে কষ্টও ঘুচতে পারে বলেও ধারণা অনেকেরই।