—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
ভারত বৈচিত্র্যময় এক দেশ। ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে উৎসবের অন্ত নেই এই দেশে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, এ দেশের সবচেয়ে বড় উৎসব কিন্তু ভোট। প্রায় প্রতি বছরেই কোনও না কোনও ভোট উৎসবে মহা উৎসাহে সামিল হচ্ছি নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখার জন্য। এই উৎসব মানেই প্রচুর অর্থ ব্যয়, পাশাপাশি রাজনৈতিক হানাহানি, মৃত্যুও। চূড়ান্ত অশান্তি।
মনে হয় না, লোকসভা, বিধানসভা, পুরসভা বা পঞ্চায়েতের মতো আলাদা আলাদা ভোটের বদলে একসঙ্গে এক বার ভোট হলে সমস্ত অশান্তি থেকেই মুক্তি?
কিন্তু আসলে কি তাই?
‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের প্রস্তাব বর্তমানে একটি তর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শুনতে এটি অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক মনে হলেও, ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সংসদীয় সার্বভৌমত্বের নিরিখে এর ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক হবে না তো? ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার প্রধান সৌন্দর্য হল স্থানীয় এবং জাতীয় ইস্যুর পৃথক অস্তিত্ব। ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি কার্যকর হলে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন এক সঙ্গে হবে। তাতে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রবল সম্ভাবনা থাকে। দেখা গিয়েছে, একই সঙ্গে নির্বাচন হলে পাড়ার নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা বা বেহাল রাস্তার সমস্যার চেয়ে জাতীয় ভাবাবেগ বেশি গুরুত্ব পাবে । ফলে আঞ্চলিক দলগুলি প্রান্তিক হয়ে পড়তে পারে এবং ভারতের বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোও সঙ্কটে পড়বে।
ভারতের সংবিধান, রাষ্ট্রকে রাজ্যসমূহের সঙ্ঘ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব রাজনৈতিক মেয়াদ ও জনমত রয়েছে। যদি কোনও রাজ্যে মাঝপথে সরকার পড়ে যায়, তবে কি সেখানে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন চলবে? তা সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার শামিল এবং সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী।
গণতন্ত্রের সার্বভৌম শক্তি হল জনগণ। প্রতি পাঁচ বছরে একাধিক বার ভোট হওয়ায় শাসকেরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য। ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি কার্যকর হলে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে এই দায়বদ্ধতা হ্রাস পাবে। কেন্দ্রীয় স্তরের কোনও প্রবল ঢেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদ বা রাজ্যের নিজস্ব দাবিগুলিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। যা গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে’র জন্য হুমকি-স্বরূপ। নির্বাচনী খরচ কমানো বা নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়নের যুক্তি আকর্ষণীয় হলেও, গণতন্ত্রের মূল্য শুধু টাকায় মাপা সম্ভব নয়। ভারতের মতো বিশাল দেশে যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি ও সমস্যা ভিন্ন ভিন্ন, সেখানে জোর করে এক ছাতার তলায় সব কিছু নিয়ে আসা সংসদীয় সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে পারে। গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে বৈচিত্র্য আর স্থানীয় দাবিদাওয়ার গুরুত্ব বজায় রাখা অপরিহার্য। —নাট্যকর্মী, বালুরঘাট
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে