WB Assembly Elections 2026

‘ঝড়’ নিয়ে চর্চা বন্ধ চা বাগানে

মাদারিহাট এলাকাতেই আর এক সঙ্গত প্রশ্ন চা বাগানে অ্যাম্বুল্যান্স না মেলা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বীরপাড়ার ঢেকলাপাড়া চা বাগানের শ্রমিক সুশীল ওরাওঁ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পার্থ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৫
Share:

ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয় বক্সা পাহাড়ের আদমার বাসিন্দাদের। নিজস্ব চিত্র ।

কালচিনির মধু চা বাগানের বাইরে চায়ের দোকানে আড্ডা। আকাশের এক কোণে কালো মেঘ। জোরে বইছে হাওয়া। মাঝবয়সি বুধু ওরাওঁ আলগোছে প্রশ্নটা পেড়ে ফেললেন আড্ডার মাঝে— ‘‘ঝড় উঠবে কি?’’

ভোট-মরসুমে এক রকম ‘ঝড়’ উঠেছিল ২০১৯ সালে। সে বছরের লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ারে ২ লক্ষ ৪৩,৯৮৯ ভোটে তৃণমূলকে হারিয়েছিল বিজেপি। সে হাওয়ায় ভর করেই ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনেও আলিপুরদুয়ার জেলার পাঁচটি আসনের সব ক’টিতেই জেতে গেরুয়া শিবির। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ারের সাংসদ হন বিজেপির মনোজ টিগ্গা। কিন্তু সে নির্বাচনে বিজেপির ভোট কমে। টিগ্গার ছেড়ে যাওয়া মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্রে উপ-নির্বাচনে জেতে তৃণমূল। তাই এ বার কোনও ঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে কিনা, সঙ্গত প্রশ্ন এই জেলায়।

মাদারিহাট এলাকাতেই আর এক সঙ্গত প্রশ্ন চা বাগানে অ্যাম্বুল্যান্স না মেলা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বীরপাড়ার ঢেকলাপাড়া চা বাগানের শ্রমিক সুশীল ওরাওঁ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের অভিযোগ, বহু চেষ্টাতেও বাড়ি থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো অ্যাম্বুল্যান্স না মেলায় মৃত্যু হয় তাঁর। ওই ঘটনার পরে প্রশাসনের তরফে জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা বা অন্তত অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছে দেওয়া নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ঢেকলাপাড়া চা বাগানের শ্রমিক রাজু ওরাওঁ বলছেন, “এখনও বাগানে অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা চালু হতে দেখলাম না। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এখনও আমাদের কাছে চিন্তার।” বক্সা পাহাড়ের সদর বাজারের বাসিন্দা ইন্দ্রশঙ্কর থাপা বলেন, ‘‘সান্তলাবাড়ি থেকে জ়িরো পয়েন্ট পর্যন্ত রাস্তা থাকলেও, বাকি গ্রামে হাঁটাই ভরসা। বর্তমানে যাতায়াতের সে রাস্তাটুকুও ঠিক নেই। এমনকি পালকি-অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবহারের অযোগ্য। ফলে, বক্সা পাহাড়ের উপরের বসতির কেউ অসুস্থ হলে কাঁধে চাপিয়ে, কাপড়ে বেঁধে বা স্ট্রেচারে করে নামাতে হয়।’’

জেলাবাসীর নিশানায় যে শুধু তৃণমূল, তেমন নয়। আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকের মধ্য পারোকাটার রতন বর্মণ বলছেন, “কবে থেকে রায়ডাক নদীর উপরে একটা সেতুর দাবি জানিয়ে আসছি আমরা। বাম জমানায় শুরু। পরে তৃণমূল বিধায়কের কাছে দাবি তোলা হয়। গত পাঁচ বছরে বিজেপি বিধায়কের কাছেও সে দাবিই ছিল। কিন্তু সব জায়গা থেকে শুধু আশ্বাস পেলাম, কাজ আর হল না!”

গত বিধানসভা ভোটে জেলার সব আসনে বিজেপি জিতলেও, আলিপুরদুয়ার সদর-সহ জেলার অন্যত্র সাধারণ মানুষের কী সুবিধা হয়েছে, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। তবে বিজেপির জেলা নেতাদের একাংশ বলছেন, গত বার পদ্ম প্রতীকে আলিপুরদুয়ার থেকে সুমন কাঞ্জিলাল জিতলেও তিনি পরে ঠাঁই নেন তৃণমূল শিবিরে। মাদারিহাট এখন তৃণমূলের দখলে। কাজ করার ইচ্ছে থাকলে, তার প্রতিফলন কেন ওই দুই বিধানসভা আসনে দেখা গেল না? জেলাবাসী এই তরজা শুনতে অভ্যস্ত। জেলায় কেন একটি মহকুমা, কুমারগ্রামে সরকারি পরিবহণ ব্যবস্থা কেন পর্যপ্ত নয়, ফালাকাটার পানীয় জলের সমস্যা কেন মেটে না, বুঝতে পারেন না তাঁরা।

আলিপুরদুয়ারে চালু কথা— চা বাগানের শ্রমিকেরা যাদের পক্ষে, জেলার ক্ষমতা তাদের পক্ষে। বাগানের শ্রমিক সংগঠনের কর্তৃত্ব নিয়ে এক সময়ে বিজেপির চা বলয়ের দুই নেতা মনোজ টিগ্গা ও জন বার্লার মধ্যে প্রকাশ্যে শুরু হয়েছিল সংঘাত। বার্লাকে সাংসদ টিগ্গার খোঁচা, ‘‘২০১৯ সালে আলিপুরদুয়ারে আমাদের দলের সাংসদ ছিলেন। কেন্দ্রের মন্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু চা বাগানের দিকে ঘুরে তাকাননি। উল্টে, রাজ্যের তৃণমূল সরকার শ্রমিকদের জন্য ‘চা সুন্দরী’ বাড়ির প্রকল্প, জমির পাট্টা-সহ বহু প্রকল্প ঘোষণা করেছিল। তাতেই চা বলয়ের বাসিন্দারা অনেকটা প্রভাবিত হন।” বার্লা এখন তৃণমূলে। তিনি পাল্টা বলেন, “আলিপুরদুয়ারের সাংসদ নিজেকে চা বলয়ের বড় নেতা পরিচয় দেন। তা হলে তাঁর নিজের এলাকায় উপনির্বাচনে বিজেপিকে হারতে হল কেন?” সিপিএমের আলিপুরদুয়ার জেলা সম্পাদক কিশোর দাস বলেন, ‘‘চা বাগান নিয়ে তৃণমূল-বিজেপি শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়েছে। সেটা শ্রমিকেরা বুঝতে পারছেন।’’ কংগ্রেসের জেলা সভাপতি তথা দলের আলিপুরদুয়ারের প্রার্থী মৃন্ময় সরকার বলছেন, ‘‘জমির অধিকার, পিএফ গ্র্যাচুইটির অধিকার ছাড়াও, চা শ্রমিকদের মজুরি যাতে সময়ে দেওয়া হয়, তা নিয়েও আমরা লড়ছি।’’

চা বলয়ের বাসিন্দারা জানেন, চাপান-উতোরে পেট ভরবে না। তাই কালচিনি লাগোয়া এলাকার একাধিক বন্ধ বাগানের শ্রমিক এখন চলে যান ভুটানে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে খাটতে। যে মধু চা বাগানের বাইরে চলছে বুধু ওরাওঁদের আড্ডা, সেখানকার বাসিন্দা বিনাউনা তিরকে বলছেন, ‘‘একটা বাগান যখন বন্ধ হয়, তখন কয়েকশো পরিবারের রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। ঘরের ছেলে-মেয়েরা যখন ভিন্‌ রাজ্যে কাজে যেতে বাধ্য হন, তখন তাঁদের পরিবারগুলোই শুধু সেই সমস্যা বোঝে।”

চা শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব সাম্প্রতিক একাধিক সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উত্তরবঙ্গে এসে একাধিক বার বন্ধ চা বাগান খোলা এবং অধিগ্রহণের কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। কিন্তু সরকারি ভাবে আলিপুরদুয়ারে চারটি বাগান এখনও বন্ধ। অচলাবস্থা আরও কয়েকটিতে। বন্ধ কলকারখানা ও চা শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা প্রকল্প ‘ফাওলাই’ (ফিনান্সিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স টু দ্য ওয়ার্কার্স ইন দ্য লকড আউট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিটস)-এ মাসে মেলে ১৫০০ টাকা। বুধুর সঙ্গেই আড্ডায় থাকা, মধু চা বাগানের আর এক শ্রমিক রাজ টোপ্পোর ক্ষোভ, ‘‘ফাওলাই অন্তত তিন হাজার টাকা করা উচিত রাজ্য সরকারের। কেউ ভাবে না, এই আয়ে কী ভাবে আমাদের সংসার চলবে!’’

আড্ডা চলছে। আকাশ ঢেকেছে কালো মেঘে । বেড়েছে হাওয়াও।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন