Kaliprasanna Singha

ইতিহাসের পাতায় শুধু নন, তিনি যেন সমকালেরও জাগ্রত বিবেক

কলকাতার ‘বাবু-সমাজ’ যখন ইংরেজি শিক্ষার মোহে আধুনিকতার বাহার মেখে আত্মতুষ্ট, তখন কালীপ্রসন্ন কলম ধরলেন ব্যঙ্গের।

রুদ্র সান্যাল

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৭
Share:

কালীপ্রসন্ন সিংহ।

ঊনবিংশ শতকে বাংলার আকাশে যে ক’টি উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা হঠাৎ জ্বলে উঠে দ্রুত নিভে গিয়েছে, তাঁদের অন্যতম কালীপ্রসন্ন সিংহ। তাঁর জন্মদিবসের আগে ফিরে দেখা দরকার— মাত্র তিরিশ বছরের জীবনে তিনি কী রেখে গেলেন, আর বর্তমান সমাজে সে সবের প্রতিধ্বনি কতখানি।

কলকাতার ‘বাবু-সমাজ’ যখন ইংরেজি শিক্ষার মোহে আধুনিকতার বাহার মেখে আত্মতুষ্ট, তখন কালীপ্রসন্ন কলম ধরলেন ব্যঙ্গের। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ শুধু সাহিত্য নয়, এক সামাজিক দলিল। অলিগলির আড্ডা, কৃত্রিম ভদ্রতা, ধর্মীয় ভণ্ডামি— সব কিছুকে তিনি এমন স্বচ্ছ আয়নায় ধরেছিলেন, যা আজও অস্বস্তি জাগায়। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু আত্মপ্রচারের লালসা, ক্ষমতার দম্ভ, সংস্কৃতির অভিনয়— এ সব কি খুব বদলেছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে ‘হুতোম’ যেন নতুন ভাষা খুঁজে পায়। আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, হয়তো ডিজিটাল পর্দায় ভেসে উঠত তাঁর ব্যঙ্গ— ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগের আড়ালে লুকোনো ভণ্ডামি উন্মোচন করতেই।

তাঁর আর-এক বিরাট কৃতিত্ব, মহাভারতের বাংলা অনুবাদ। সংস্কৃতের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেঙে সাধারণ শিক্ষিত বাঙালির হাতে তিনি তুলে দিয়েছিলেন মহাকাব্যের আস্বাদ। জ্ঞানকে সহজ করে দেওয়ার এই দায়বদ্ধতা আজকের ‘ওপেন সোর্স’ বা উন্মুক্ত শিক্ষার ধারণার পূর্বাভাস যেন। ভাষা তাঁর কাছে ছিল ক্ষমতায়নের হাতিয়ার— এ কথা আজও প্রাসঙ্গিক, যখন মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রশ্নে বিতর্ক চলছেই। কালীপ্রসন্ন বুঝেছিলেন, জ্ঞান যদি শুধু অভিজাতের সম্পত্তি হয়ে থাকে, তবে সমাজে প্রকৃত আলোকপ্রাপ্তি ঘটে না।

কালীপ্রসন্ন ছিলেন দানশীলও। বিধবা-বিবাহের পৃষ্ঠপোষকতা, দুঃস্থের পাশে দাঁড়ানো, সাহিত্যচর্চায় অর্থব্যয়— সবই তাঁর সামাজিক দায়বোধের পরিচয়। সমকালীন সমাজ-সংস্কার আন্দোলনে তাঁর আর্থিক সহায়তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজকে কিছু দেওয়ার যে মানসিকতা, তা আজকের ভোগবাদী সময়ে বিরল বলেই মনে হয়। কর্পোরেট সমাজ-দায়িত্বের যুগে তাঁর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা যেন উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে।

তবে তাঁকে নিখুঁত প্রতিমা করাও সমীচীন নয়। তিনি ছিলেন শহুরে অভিজাত পরিমণ্ডলের সন্তান। ফলে তাঁর ব্যঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু মূলত নাগরিক সমাজ। গ্রামীণ বাংলার নিঃশব্দ বেদনা ততটা জায়গা পায়নি তাতে। এই সীমাবদ্ধতাই তাঁকে আরও মানবিক করে— কারণ প্রতিটি যুগস্রষ্টাই নিজের সময়ের সন্তান। তবু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তিনি যে সাহস দেখিয়েছেন, তা অনস্বীকার্য। ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও ক্ষমতার সমালোচনা করার সাহস।

জন্মদিবসে তাই কালীপ্রসন্নকে স্মরণ মানে শুধু অতীত-চর্চা নয়, আত্ম-সমালোচনার সাহস জাগানো। সমাজকে আয়নায় দেখার সেই দুঃসাহস, ভাষাকে মানুষের করে তোলার সেই উদ্যোগ আজও আমাদের প্রয়োজন। ‘হুতোম’-এর তীক্ষ্ণ হাসি যেন মনে করিয়ে দেয়, সত্য বলার ভাষা যতই রসিক হোক, তার লক্ষ্য থাকে নির্মম স্পষ্টতায়। কালীপ্রসন্ন সিংহ তাই শুধু ইতিহাসের পাতায় নন, তিনি আমাদের বর্তমানেরও এক জাগ্রত বিবেক।

ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিধাননগর সন্তোষিণী বিদ্যাচক্র হাই স্কুল, শিলিগুড়ি

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন