হেঁটে কেন ফিরলাম
coronavirus

রেললাইন ধরে হাঁটছি, মনে হয়েছে শুয়ে পড়ি

কী করব বলুন? লকডাউনের পর থেকে কাজকর্ম নেই। হাতে টাকা শেষ। এই অবস্থায় কী ভাবে থেকে যাব বিজন বিভুঁইয়ে? রাজমিস্ত্রির কাজ করি।

Advertisement

আবুল কাশিম

শেষ আপডেট: ১৫ মে ২০২০ ০৬:২১
Share:

পদাতিক: হেঁটে বাড়ির পথে পরিযায়ী শ্রমিকের দল। বৃহস্পতিবার ময়নাগুড়িতে। ছবি: দীপঙ্কর ঘটক

হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত লাগছিল। গাছের নীচে দু’দণ্ড বসেছি। চোখের পাতা জুড়ে এসেছে। তখনই মনে পড়েছে সুরাইয়া আর সোমাইয়ার মুখ। আমার দুই মেয়ে। শুধু তাদের টানে আবার উঠে হাঁটতে শুরু করেছি।

Advertisement

হাঁটতে হাঁটতে পথে পেলাম রেললাইন। মনে হল, এই লাইন তো সোজা চলে গিয়েছে কোচবিহার। তা হলে যদি লাইন ধরে এগোই পৌঁছে যেতে পারব নিজের বাড়ির কাছে। কিন্তু যদি ক্লান্ত লাগে? মনে হয়েছিল, লাইনের ধারে পাশে কোথাও শুয়ে পড়ব। তখনও জানি না, আওরঙ্গাবাদে কী ভাবে রেল লাইনে শুয়ে থাকা শ্রমিকদের উপর দিয়ে চলে গিয়েছে মালগাড়ি। ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে মানুষগুলো। কিন্তু কী করব বলুন? লকডাউনের পর থেকে কাজকর্ম নেই। হাতে টাকা শেষ। এই অবস্থায় কী ভাবে থেকে যাব বিজন বিভুঁইয়ে? রাজমিস্ত্রির কাজ করি। কোচবিহারে তেমন ভাবে কাজ পাওয়া যায় না। যেটুকু পাওয়া যায় তারও পারিশ্রমিক খুব কম। এমন অবস্থায় সংসার চালাতে নিত্য দিন কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়। একটু স্বচ্ছলতার খোঁজে অরুণাচলপ্রদেশ যাওয়ার কথা ভাবি।

লকডাউনের কয়েক দিন আগে এক ঠিকাদারের মাধ্যমে আমরা গ্রামের ছয়জন অরুণাচলে যাই। সেখানে প্রতিদিন কাজ। মজুরিও বেশ ভাল। কয়েক দিন কাজ করার পরে খুব খুশি ছিলাম। ভেবেছিলাম, বেশ কিছু পয়সা হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরব। বাড়িতে স্ত্রী, ছোট ছোট দুই মেয়ে এবং মা-বাবা থাকেন। তাঁদের কথা ভেবেই তো ভিন রাজ্যে পাড়ি দিই। তখন করোনা ভাইরাস, লকডাউন নিয়ে আমরা কিছু ভাবিনি। ভাবার কথাও নয়। আমরা তো কোনওদিন এমনটা শুনিনি।

Advertisement

লকডাউন শুরু হতে পড়ে যাই বিপদে। সবাই ঘরবন্দি। প্রথমে হাতে যা টাকা-পয়সা ছিল তা দিয়েই খাদ্যসামগ্রী কিনতে শুরু করি। খাদ্যসামগ্রী বলতে চাল-আলু, লবণ একটু সরিষার তেল। সেদ্ধ-ভাত খেয়েই চলতে থাকে আমাদের জীবন। চল্লিশ দিন পর সে খাবারও শেষ হয়ে যায় একদিকে পেটে ভাত নেই, আরেকদিকে পরিবারের কষ্ট। সবমিলিয়ে বাড়ি ছাড়া আর অন্য কথা ভাবতে পাচ্ছিলাম না। বার বার মনে হচ্ছিল, মৃত্যু যদি হয় তো জন্মভূমিতেই হোক। ৪ মে ভোরবেলা আমরা অরুণাচল থেকে রওনা হয়ে পড়ি। আমাদের সঙ্গে আরও অনেকেই ছিলেন। একটি বাস জোগাড় করি সবাই মিলে। মাঝপথে এসে সেই বাস আটকে দেয় পুলিশ। তার পর সড়ক পথে হাঁটা শুরু, অবশেষে রেললাইন ধরে হাঁটা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আমরা হাঁটতেই থাকি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement