—ফাইল চিত্র।
যত কাণ্ড, সবই যেন মালদহে। নিত্যদিনই বোমা, গুলি, খুন, ছিনতাই এর মতো ঘটনা ঘটছে মালদহ জেলায়। কখনও দুষ্কৃতীদের লড়াই এর মাঝে পড়ে প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ মানুষজনের। আবার কখনও গুলিবিদ্ধ হচ্ছেন পথ চলতি সাধারণ মানুষ। এমনকী, দুষ্কৃতীদের হাতে আক্রান্ত হতে হয়েছে খোদ পুলিশকেও। শুধু তাই নয়, প্রাণ ভয়ে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে পালানোরও নজিরও রয়েছে মালদহে।
বিরোধীদের অভিযোগ, জেলার আইনশৃঙ্খলা একেবারে ভেঙে পড়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। মালদহের পুলিশ সুপার অর্ণব ঘোষ বলেন, ‘‘সমস্ত ঘটনার তদন্ত চলছে। বেশ কিছু ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য ঘটনায় অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।’’
পুলিশের যুক্তি অবশ্য মানতে নারাজ এলাকার মানুষ। চেষ্টা করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুষ্কৃতীরা অধরা কেন সেই প্রশ্নে ক্ষোভ বাড়ছে মালদহে। যেমন, গত রবিবার কালিয়াচকের শেরশাহি গ্রামে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে দুষ্কৃতীদের গুলিতে জখম হন রাসেদ শেখ। তাঁর একটি মুদিখানা দোকান রয়েছে। বাঁ পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন মালদহের একটি নার্সিংহোমে। ওই দিনই রাতে গাজলের পান্ডুয়ায় ৫০ হাজার টাকা তোলা না দেওয়ায় এক ব্যবসায়ী ও তাঁর ছেলেকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে। ওই ব্যবসায়ী আজাদুর শেখ এবং তাঁর ছেলে ইদুল শেখ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রিভলবারের বাঁট দিয়ে তাঁদের মাথায় আঘাত করা হয়। রাতেই তাঁরা গাজল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। ওই দু’টি ঘটনাতেও অধরা দুষ্কৃতীরা।
জেলাতে একের পর এক ব্যবসায়ী আক্রান্ত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ী মহল। মালদহ মার্চেন্ট চেম্বার অফ কর্মাসের সম্পাদক উজ্জ্বল সাহা বলেন, ‘‘মালদহে পুলিশের শাসন নেই। দিনের পর দিন ব্যবসায়ীরা আক্রান্ত হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ পুলিশ।’’ পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার দাবিতে পথে নামার হুমকি দিয়েছেন উজ্জ্বলবাবু।
দুষ্কৃতীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে স্কুলেও। জুলাই মাসেই আকন্দবেড়ি হাইস্কুল থেকে উদ্ধার হয় আগ্নেয়াস্ত্র। গত রবিবার কালিয়াচকের জামিরঘাটা মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের মাঠ থেকে উদ্ধার হয় অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ। ওই যুবকের গলার নলি কেটে স্কুল মাঠের মধ্যে খুন করা হয়েছে। স্কুল গুলিতেও এমন ঘটনা ঘটায় আতঙ্কিত শিক্ষক ও অভিভাবকরা। কালিয়াচকের এক স্কুল শিক্ষক বলেন, ‘‘স্কুলের মধ্যেই আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়েও আমরা চিন্তিত।’’
জুলাই মাসেই কালিয়াচকের নওদা যদুপুরে ইব্রাহিম শেখের স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে অপহরণ করে খুনের অভিযোগ ওঠে এলাকার ত্রাস বকুল শেখের বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রতিবাদে দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে জাতীয় সড়ক অবরোধ। অবরোধ তুলতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের উপর হামলা চালায় একদল দুষ্কৃতী। পুলিশের গাড়িতেও ভাঙচুর করা হয়। আক্রান্ত হন এক এএসআই-সহ দুই পুলিশ কর্মী। তখন প্রাণভয়ে গাড়িতেই আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠি ফেলে পালিয়ে যান উপস্থিত পুলিশকর্মীরা।
কেন জেলার আইনশৃঙ্খলা এমন অবস্থা? এই প্রশ্নে পুলিশের একাংশকেই দুষেছেন সাধারণ মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ কর্মীদের একাংশ দুষ্কৃতীদের মদত দিচ্ছে। ফলে অধরা থেকে যাচ্ছে দুষ্কৃতীরা। আর যখন তখন সক্রিয় হয়ে উঠছে তারা। জেলা কংগ্রেসের সভাপতি তথা সাংসদ মৌসম বেনজির নুর বলেন, ‘‘জেলা জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দু্ষ্কৃতীরা। রোজ খুন, গুলি, ছিনতাই এর মতো ঘটনা ঘটছে জেলায়। অধিকাংশ ঘটনায় শাসক দলের মদত রয়েছে। যার জন্য জেলায় পুলিশ নির্বিকার রয়েছে।’’
জেলা কংগ্রেস নেতৃত্বের সুরে সুর মিলিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সিপিএমের জেলা সম্পাদক অম্বর মিত্রও। তিনি বলেন, ‘‘মানুষ এখন বাড়িতেও নিরাপদ নয়। থানার পুলিশও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের ভয়ে রাস্তায় অস্ত্র ফেলে পালাতে হচ্ছে পুলিশকে।’’ জেলাতে একের পর এক ঘটনা ঘটলেও পুলিশের পাশেই দাঁড়িয়েছে শাসক দল। তৃণমূলের জেলা সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘‘বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটছে ঠিকই। তবে জেলায় পুলিশ আইন অনুযায়ীই পদক্ষেপ করছে।’’