কিশোরেরা ট্রাকও চালায়, উদাসীন প্রশাসন

শিশু শ্রমিক যে রয়েছে, তা স্বীকার করে নিচ্ছে প্রশাসনও। কিন্তু তার প্রতিকারের রাস্তা কী, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও প্রশাসনিক ব্যবস্থার রূপরেখা পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুশ্রম রোধে অভিযান চালানো হবে বলেই দায় এড়িয়েছে প্রশাসন। কিন্তু উত্তর দিনাজপুর ও মালদহের প্রচুর ইটভাটা বা খাবারের দোকানে সকলের চোখের সামনেই প্রতিদিন বহু শিশুশ্রমিক কাজ করে। মালদহে ট্রাক্টরও চালায় কিশোরেরা।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১২ মে ২০১৫ ০২:১০
Share:

শিশু শ্রমিক যে রয়েছে, তা স্বীকার করে নিচ্ছে প্রশাসনও। কিন্তু তার প্রতিকারের রাস্তা কী, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও প্রশাসনিক ব্যবস্থার রূপরেখা পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুশ্রম রোধে অভিযান চালানো হবে বলেই দায় এড়িয়েছে প্রশাসন। কিন্তু উত্তর দিনাজপুর ও মালদহের প্রচুর ইটভাটা বা খাবারের দোকানে সকলের চোখের সামনেই প্রতিদিন বহু শিশুশ্রমিক কাজ করে। মালদহে ট্রাক্টরও চালায় কিশোরেরা। উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, হেমতাবাদ, ইটাহার, করণদিঘি, ইসলামপুর, চোপড়া, গোয়ালপোখর-১ ও ২ ব্লকের বিভিন্ন এলাকার ইটভাটা, হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান সহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ১৮ বছরের কম প্রায় পাঁচ হাজার শিশুশ্রমিক কাজে নিযুক্ত রয়েছে। পিংলার ঘটনার পরে এই শিশু শ্রমিকদের বিপদের আশঙ্কা কতটা? রায়গঞ্জ মহকুমা শ্রম আধিকারিক আলি আহমেদ আলমগির বলেন, ‘‘পিংলার ঘটনার পর আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, উত্তর দিনাজপুরের কোনও এলাকায় কোনও বেআইনি কারখানা, পাথর খাদান বা বিপজ্জনক ক্ষেত্র নেই।’’

Advertisement

কিন্তু প্রশাসন শিশু শ্রম রোধে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? তিনি জানান, জেলার নয়টি ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় দফতরের পরিদর্শক, আধিকারিক ও কর্মীরা নিয়মিত শিশুশ্রম বিরোধী অভিযান চালান। ব্যবসায়ীদের ১৮ বছরের কম বয়সী কাউকে কাজে নিযুক্ত না করারও অনুরোধ করা হয়। বেআইনিভাবে প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে শিশুশ্রমিক নিয়োগ করার অভিযোগে কয়েক মাস আগে জেলার বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু বাসিন্দার বিরুদ্ধে পুলিশ ও আদালতে মামলাও করা হয়েছে। সেই মামলার শুনানি চলছে। চার শিশু শ্রমিককে উদ্ধারও করা হয়েছে। তবে লিখিত অভিযোগ নেই বলে শিশু শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছিল এমন হোটেলগুলির মালিকদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

মালদহের চাঁচলে ৪২টি ইটভাটা রয়েছে। ওই ইটভাটাগুলিতে বহু শিশু-কিশোর শ্রমিক হিসাবে কাজ করে। পাশাপাশি ইটভাটাগুলিতে ট্রাক্টরে করে মাটি সরবরাহ করা হয়। ওই ট্রাক্টরের চালকদেরও অনেকেরই বয়স ১৪ থেকে ১৬-র কোঠায়। মাঝে মধ্যেই ট্রাক্টর উল্টে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। বছরখানেক আগে হরিশ্চন্দ্রপুরের দ্বেগুনে এমনই এক ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৩ বছরের এক ট্রাক্টর চালকের। ওই ঘটনার পর প্রশাসনের তরফে ইটভাটাগুলিতে অভিযান চালিয়ে শিশু-কিশোর শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করতে অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও কাজের কাজ যে হয়নি, তা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে প্রায় প্রতিটি ইটভাটায় গেলেই শিশু-কিশোর শ্রমিকদের দেখা মেলে। যারা পরিবারের বড়দের সঙ্গে মাটি বহন সহ ইট তৈরির কাজ করছে। অথচ শৈশব থেকেই টানা ইটভাটায় কাজ করায় তারা দূষণে আক্রান্ত হওয়ায় তাদের শরীরে রোগ বাসা বাঁধছে। এ ছাড়া, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে মিষ্টি তৈরির দোকান, এমনকি পরিবহণ ক্ষেত্রেও শিশু-কিশোর শ্রমিকদের হামেশাই দেখা মেলে। চাঁচলের মহকুমাশাসক পোন্নমবলম এস বলেন, ‘‘শিশুশ্রম বেআইনি। আগেও অভিযান চালানো হয়েছে। শ্রম দফতর, পুলিশকে নিয়ে খুব শীঘ্রই ইটভাটাগুলিতে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্য কোথাও শিশু শ্রমিক থাকলেও মালিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

Advertisement

মালদহ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে গাড়িতে ঝুঁকি নিয়ে সহকারি চালকের কাজ করে কিশোরেরা। এর ফলে ঘটে নানা দুর্ঘটনা। মালদহ জেলার গাজলে প্রচুর ইট ভাটা ও টালির ভাটা রয়েছে। সেই সব ভাটাগুলিতে কাজ করতে দেখা যায় ১৪ থেকে ১৬ বছরের ছেলেদের। গাজলের ঘাকশোল, রসিকপুর, আদমপুর, আলমপুর প্রভৃতি এলাকায় এমন দৃশ্য দেখা যায়। সহকারি চালকের কাজ করতেও দেখা যায় তাদের। ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত অবস্থায় গাড়ির ছাদ থেকে নীচে নেমে আসে। ফলে যে কোন মুহূর্তে গাড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর পাশাপাশি ভিন্ রাজ্যে ১৪ থেকে ১৬ বছরের ছেলেদের কাজে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কালিয়াচক, বৈষ্ণবনগর, হবিবপুর, বামনগোলা প্রভৃতি এলাকার ছেলেরা কখনও মাটি কাটার কাজে, কখনও টাওয়ারের কাজে যায়। মালদহের অতিরিক্ত জেলা শাসক (সাধারণ) দেবতোষ মন্ডল বলেন, ‘‘শিশু শ্রম রোধে জেলাতে অভিযান চালানো হয়। প্রয়োজনে অভিযানের মাত্রা বাড়ানো হবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement