পুরনো তাঁতেই কাজ চালাচ্ছেন শিল্পীরা। —নিজস্ব চিত্র।
শান্তিপুরি, ফুলিয়া, বালুচরি—পুজো আসতেই এমন বাহারি তাঁতের শাড়িতে ছেয়ে গিয়েছে বাজার। কিন্তু চাহিদা থাকলেও উৎসাহ হারাচ্ছেন পুরাতন মালদহের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের তাঁতিরা। ফলে ভরা পুজোর মরসুমেও ব্যস্ততা নেই তাঁতি পাড়ার বিলাসচন্দ্র দাস, বিজয় দাসদের। তাঁদের বাড়ির অধিকাংশ তাঁতই বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নত মানের তাঁত বুনতে ব্যর্থ তাঁরা। প্রশিক্ষণ না থাকায় সাধারণ তাঁতের শাড়ি বুনেই সংসার চালাতে হচ্ছে বিজয়বাবু, বিলাসবাবুদের। এর জন্য তাঁরা দায়ী করছেন প্রশাসনের উদাসীনতাকেই।
তাঁরা বলেন, ‘‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁত বুনতে পারছি না আমরা। উন্নত মানের তাঁত বুনতে হলে প্রশিক্ষণ দরকার। বাবা-কাকাদের কাছে কাজ শিখে কোনও রকমে এই পেশায় টিকে রয়েছি। নতুন প্রজন্মের কেউই আসছে না এই পেশাতে।’’ প্রশাসন এখনই কোন পদক্ষেপ না নিলে অস্তিত্ব হারাবে পুরাতন মালদহের এই তাঁত শিল্প। যদিও পুরসভার তরফ থেকে তাঁতিদের সব রকম সাহায্য করার চেষ্টার আশ্বাস দেওয়া রয়েছে। পুরাতন মালদহ পুরসভার তৃণমূলের পুরপ্রধান কার্তিক ঘোষ বলেন, ‘‘তাঁত শিল্প ওই এলাকার ঐতিহ্য। আমরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছি। তাঁদের সমস্যার কথা প্রশাসনের কর্তাদের জানানো হয়েছে। আর পুরসভার তরফ থেকে যতুটুকু করা সম্ভব করা হবে।’’
পুরাতন মালদহ পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে মালদহ-নালাগোলা রাজ্য সড়কের ধারে এই তাঁতি পাড়া। এলাকায় প্রায় দু’শোটি পরিবার বসবাস করে। বছর দশেক আগেও প্রতিটি পরিবারে কমবেশি পাঁচটি করে তাঁত ছিল। তাঁতের খটখট শব্দে সব সময় ব্যস্ত হয়ে থাকত এলাকা। তাঁতের শাড়ি থেকে গামছা, ধুতি প্রভৃতি তৈরি করা হতো। তাঁরা নিজেরাই বাজারে গিয়ে সে সব বিক্রি করতেন। এখন ওই এলাকায় জনা কুড়ি পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তবে প্রতিটি পরিবারেই রয়ে গিয়েছে তাঁত। অনেকে এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কারণ সারা দিন পরিশ্রম করে দু’টির বেশি শাড়ি তৈরি করতে পারেন না তাঁরা।
জানা গেল, তাঁদের তৈরি শাড়ি পাইকারেরা ২০০ টাকা দরে কিনে নেন। এ দিকে সুতোর দামও বাড়ছে। এক বান্ডিল সুতোর দাম ২৪০০ টাকা। বছরভর ধিকধিক করে চলা তাঁতি পাড়ার এই শিল্পীরা পুজোর সময় বাড়তি অর্থ উপার্জন করবেন, তারও উপায় নেই। কারণ উন্নত মানের তাঁত বুনতে ব্যর্থ তাঁরা। সেই আমল থেকেই গতানুগতিক পদ্ধতিতে তাঁরা বুনে আসছেন। এখনও সেই পুরনো দিনের মতোই তৈরি করছেন ছোট পাড়ের সাধারণ তাঁতের শাড়ি। সেই সঙ্গে ধুতি এবং গামছাও। যার ফলে এই যুগের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছেন না তাঁরা।
এই তাঁত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আট বছর আগে ওই এলাকায় করা হয়েছিল তাঁতের সমবায় সমিতি। সেখানেও প্রথম দিকে ১৪টি তাঁত চলত। এখন মাত্র সাতটি তাঁত চলছে। এই সমবায়তেও সাধারণ তাঁতের শাড়িই তৈরি করা হয়। এই সমবায় সমিতির প্রবীন এক সদস্য প্রভাত দাস বলেন, ‘‘গঙ্গারামপুর, জিয়াগঞ্জ প্রভৃতি এলাকার তাঁতের ব্যাপক চাহিদা। কারণ ওই সব এলাকার তাঁতিরা উন্নত মানের তাঁত বুনতে পারেন। এই বাজারে আমাদের সাধারণ শাড়ি আর চলে না। সমবায়ের শুরুর দিকে এক বার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে তাতে লাভ হয়নি। তাই সমবায়ের এমন করুণ অবস্থা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে প্রশিক্ষণ নিয়েই তাঁত বুনতে হবে।’’ মালদহের অতিরিক্ত জেলাশাসক দেবতোষ মণ্ডল বলেন, ‘‘তাঁতিদের জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় কিনা, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’’