ফটিকচন্দ্র সরকার। নিজস্ব চিত্র।
জাতীয় সড়কের উপর দাঁড়িয়ে থাকা পণ্যবোঝাই লরিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি পুলিশ ভ্যান ধাক্কা মারলে মৃত্যু হয় এএসআই-এর। লরির ক্ষতি না হলেও পুলিশ ভ্যানটি দুমড়ে মুচড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন গাড়ির চালক-সহ দুই পুলিশ কর্মী। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ ঘটনাটি ঘটেছে পুরাতন মালদহের নারায়ণপুরে। ঘটনায় শোকের ছায়া নামে পুলিশ মহলে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত এএসআই ফটিকচন্দ্র সরকার (৫৫) বালুরঘাটের বাধামাইল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মালদহ থানার অফিসার ছিলেন। আহত হয়েছেন কনস্টেবল মোহিতকুমার সরকার, হোমগার্ড অনিল হালদার এবং চালক অমিত রাউত। এর মধ্যে মোহিতবাবু আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ইংরেজবাজার শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে। মালদহের পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। মৃতদেহটি ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।’’
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন রাতে মোবাইল ভ্যানের দায়িত্বে ছিলেন ফটিকবাবু। মালদহ থানা থেকে রাত্রি ৯টা নাগাদ এক জন করে কনস্টেবল ও হোমগার্ডকে নিয়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ডিউটিতে যান। সঙ্গে ছিলেন গাড়ির চালক। রাত ১২টা নাগাদ পুরাতন মালদহের আট মাইল থেকে ফেরার সময় নারায়ণপুরের কাছে একটি লরিকে ওভারটেক করতে যায় পুলিশ ভ্যানটি। তখনই জাতীয় সড়কের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি পণ্য বোঝাই লরিকে ধাক্কা মারে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দ্রুত গতিতে থাকায় নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি চালক। চালকের পাশে ছিলেন ফটিক বাবু। তাঁর দিকেই ধাক্কা লাগায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর।
স্থানীয়েরা তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে নিয়ে যান মৌলপুর গ্রামীণ হাসপাতালে। তবে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় রাতেই তাঁদের ইংরেজবাজার শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন চিকিৎসকেরা। রাতেই ফটিকবাবুর দেহ ময়না তদন্তের জন্য পাঠায় মালদহ মেডিক্যাল কলেজ।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ফটিকবাবুর তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এক মাত্র ছেলে কমলেশ সরকার এ বারই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেছে। ফটিকবাবু পরিবার নিয়ে ইংরেজবাজারের পুলিশ লাইনের আবাসনে থাকতেন। ২০০৪ সালে পরিবার নিয়ে মালদহে আসেন তিনি। ২০১৩ সাল থেকে মালদহ থানায় রয়েছেন। তাঁর ছেলে কমলেশ বলেন, ‘‘গতকাল রাত ১০টাতেও বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। গৌড় মহাবিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ফর্ম তুলতে বলে ফোন রেখে দেন। এর ঘণ্টা দুয়েক পরেই ঘটনাটি জানতে পারি। ফটিকবাবুর জামাই অমিতকুমার লাহা বলেন, ‘‘চাই পুলিশ প্রশাসন তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সবরকম সাহায্য করেন।’’
পুলিশের একাংশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জাতীয় সড়কের উপর বেআইনি ভাবে গাড়ি পার্কিং করে রাখা থাকে। নিয়মিত অভিযান চালানোর পরেও পণ্য বোঝাই লরিগুলি সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকে। এটা না হলে ফটিকবাবুকে মরতে হতো না। এ দিকে, পুলিশের একাংশ এও জানান, গাড়িটি প্রচণ্ড গতিতে ছিল বলেই চালক গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। দু’বছর আগে পুলিশের গাড়ির চাকরিতে যোগ দিয়েছেন অমিত। লরি আটক করলেও তার চালক পলাতক।
এ দিন সকালে বালুরঘাটের বাদামাইল এলাকায় আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। ওল্ড মালদহ থানায় কর্মরত ফটিকবাবুর দেহ এদিন সন্ধে ৭টা নাগাদ মালদহ থেকে বালুরঘাটের বাদামাইল এলাকার বাড়িতে পৌঁছলে শোকে ডুবে যায় গোটা বাদামাইল এলাকা। ফটিকবাবুর দুই মেয়ের বিয়ে হলেও উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া ছোট ছেলে কমলেশকে নিয়ে ভেঙে পড়েছেন সদ্য বিধবা স্ত্রী সুষমাদেবী। ফটিকবাবুর মৃত্যুতে সংসার সামলে কী ভাবে ছেলের লেখাপড়া চালাবেন তাই ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।