দীর্ঘ দিন ধরেই রিকশার চাকায় জড়িয়ে পড়েছিল শহরের অলিগলি। বছর দশেক আগে তাতে যোগ দেয় সিটি অটোও।
তাতে বাসিন্দাদের কিছু সুবিধা হয়। কিন্তু সেই সঙ্গেই যোগ হয়েছিল যানজট, একাংশ চালকদের অভব্য আচরণ, ভাড়ার অত্যাচারের মতো দুর্ভোগও। আর এই সরণিতে সম্প্রতি যোগ হয়েছে টোটো। যার ‘দাপটে’ শহরের রিকশা এবং অটো চালকেরাও আজ প্রায় অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন। হাসপাতাল মোড় বা গোষ্ঠপাল মোড় হোক বা পুরসভার সামনে বা রেলগেট, সাত সকাল থেকে বেশি রাত অবধি টোটর ভিড়ে হাঁটাচলাই দায় হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ। গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার টোটোতে ছেয়ে গিয়েছে শহর শিলিগুড়ি এবং লাগোয়া এলাকায়।
গত ৮ ডিসেম্বর থেকে টোটোর নথিভুক্তিকরণ এবং রুট নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে পরিবহণ দফতর। আপাতত বাছাই হয়েছে অলিগলির ১১০টি রুট। নতুন বছরে শুরুতে প্রক্রিয়া শেষ হবে। কিন্তু কোন রুটে কত টোটো ঘুরবে, তা এখনও ঠিক না হওয়ায় বিভ্রান্তি কিছুটা থেকে যাচ্ছে বলেই বাসিন্দাদের অভিযোগ। বহু বাসিন্দাই জানাচ্ছেন, সরকারি ভাবে নথিভুক্তর আগেই যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে প্রতি রুটে কত গাড়ি চলবে, তা প্রশাসনের তরফে জানানো দরকার ছিল। নইলে একাধিক গাড়ি একই রুটে চলতে শুরু করলে যানজট তো বাড়বেই, সেই সঙ্গে ভাড়া ধরা নিয়ে গোলমালের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শহরে টোটো নিয়ন্ত্রণ আবশ্যিক হয়ে পড়েছে।
যদিও সরকারের যুক্তি অন্য রকম। জেলা পরিবহণ বোর্ডের চেয়ারম্যান তথা জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব বলেন, ‘‘বেআইনি ভাবে টোটো চলতে দেওয়া হবে না বলেই সরকারি ভাবে নথিভুক্তিকরণ শুরু হয়েছে। আমরা দেখে নিতে চাইছি, ঠিক কত আবেদনপত্র পড়ছে। তারপরে রুট হিসাবে তা ভাগ করে সীমিত সংখ্যক টোটোর পারমিট দেওয়া হবে।’’ আর জেলা পরিবহণ বোর্ডের সদস্য মদন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, কোনওভাবেই শহরকে যানজটমুক্ত করতেই এই পরিকল্পনা। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকারের অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার নির্দেশিত ই-রিকশা বা টোটো ছাড়া রেজিস্ট্রেশন, পারমিট মিলবে না। আবেদনপত্রে খতিয়ে দেখে ‘অফার লেটার’ দেওয়া হবে। সেখানেই কী গাড়ি পরিষ্কার হয়ে যাবে। এতে অনেক টোটোর সংখ্যা কমবে। স্থানীয় ভাবে তৈরি গাড়ির কোনও পারমিট মিলবে না।
বাসিন্দাদের বর্তমান অভিজ্ঞতা অবশ্য সুখের নয়। শক্তিগড় এলাকার বাসিন্দা গৌতম ঘোষাল বলেন, ‘‘কয়েকদিন আগে স্টেডিয়ামের সামনে থেকে হাসপাতালের পাশে যেতে পারছিলাম না। সর্বত্র টোটো’র দাপাদাপি। রাস্তায় হাঁটাচলা দায় হয়ে পড়ে। খুব কষ্ট করে হাসপাতালে যাই।’’ শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তথা লেখক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘হাকিমপাড়ায় বাড়ির সামনে, বড় রাস্তায় টোটোর দাপাদাপি দেখে হাঁফিয়ে উঠেছি।’’
বাসিন্দারা জানান, এনজেপি মোড় থেকে ঝংকার মোড়, জংশন, চম্পাসারি, রথখোলা, সংহতিমোড়, প্রধাননগর কোনও এলাকা বাদ নেই। মাটিগাড়া, ফাঁসিদেওয়া, নকশালবাড়িরও একই দশা। ছেয়ে গিয়েছে টোটো। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নেই। ভাড়ার সরকারি তালিকা ঝোলানো নেই। রাতে ব্যাটারি বাঁচাতে আলো জ্বালানো হচ্ছে না। বড় রাস্তায় ওঠার কথা না থাকলেও তা রমরমিয়ে চলছে। বাসিন্দাদের দাবি মানছেন তৃণমূল নেতারাও। আইনটিটিইউসি-র জেলাসভাপতি তথা তৃণমূল টোটো ইউনিয়নের নেতা অরূপরতন ঘোষ বলেন, ‘‘আমরা চাই আইন মেনে সুশৃঙ্খলভাবে শহরে অলিগলিতে টোটো চলুক। সেই প্রক্রিয়াই চলছে।’’
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, শিলিগুড়ি শহর এবং আশেপাশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিকশা রয়েছে ৬ হাজার। এর বাইরে রোজ লাগোয়া গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি থেকে শহরে আসে অন্তত ১০ হাজার রিকশা। সিটি অটো রয়েছে ১৩৫০। আর টোটো চলছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার। এই টোটোকেই ৩ হাজারের মধ্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। ২৪ ডিসেম্বর নথিভুক্তি করণের শেষ দিন ছিল। চলতি মাসে প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা চলছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুসারে আপাতত ফাঁসিদেওয়া ব্লকে ৮টি রুট, নকশালবাড়িতে ৩৫টি রুট, মাটিগাড়ায় ১৮টি রুট, খড়িবাড়িতে ১৯টি এবং শিলিগুড়ি শহরে ৩১টি রুট ঠিক হয়েছে। তবে রুট প্রতি গাড়ির সংখ্যা ঠিক হলে, টোটোগুলি আরও নিয়ন্ত্রিত হত হলে শহরের বাসিন্দারা মনে করছেন।