দাগাপুরে প্রধান বিচারপতি

দু’ভাইয়ের বিবাদ মিটল মিনিটেই

বছরের পর বছর সমস্যা মেটেনি। সেই সমস্যাই যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মিটে যেতে পারে, এমন নজিরেরই সাক্ষী থাকল দাগাপুর! রবিবার শিলিগুড়ির অদূরে দাগাপুরে হাইকোর্টের বিচারপতিদের উপস্থিতিতে মহকুমা প্রশাসন এবং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে লোক আদালত প্রকল্পের আইনি পরিষেবা অনুষ্ঠানে এমনটাই দেখলেন আইন কলেজের ছাত্রছাত্রী, এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান এবং অন্যান্য সদস্যরা।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:২৮
Share:

মিষ্টিমুখ। মঞ্চে মঞ্জুলা চেল্লুর ও জয়মাল্য বাগচী। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

বছরের পর বছর সমস্যা মেটেনি। সেই সমস্যাই যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মিটে যেতে পারে, এমন নজিরেরই সাক্ষী থাকল দাগাপুর!

Advertisement

রবিবার শিলিগুড়ির অদূরে দাগাপুরে হাইকোর্টের বিচারপতিদের উপস্থিতিতে মহকুমা প্রশাসন এবং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে লোক আদালত প্রকল্পের আইনি পরিষেবা অনুষ্ঠানে এমনটাই দেখলেন আইন কলেজের ছাত্রছাত্রী, এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান এবং অন্যান্য সদস্যরা। এ দিন মঞ্চে নাগেশ্বর প্রসাদ এবং রাজেশ প্রসাদ নামে দুই ভাইয়ের সম্পত্তি বিবাদ নিয়ে একটি মামলা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুর সামনে আনা হয়। দুই ভাই বিবাহিত, তাঁদের সন্তান রয়েছে। চম্পাসারির পৈতৃক বাড়়িতে বড় ভাই নাগেশ্বরবাবু থাকেন। ছোটভাই গোলমালের জেরে পরিবার নিয়ে অন্যত্র ভাড়া বাড়িতে থাকেন। দুই কাঠা জমিতে ওই বাড়ির ভাগ এবং পারিবারিক গোলমাল নিয়েই সমস্যা। বড় ভাই তৃণমূলের নেতাও। সম্প্রতি পুরভোটে ওই এলাকায় কাউন্সিলর পদে তৃণমূলের প্রার্থীর নিবার্চনী এজেন্টও ছিলেন। একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ছোট ভাইকে জেলও খাটতে হয়েছে। ছোটভাইয়ের পরিবার পাল্টা মামলা করেছে।

প্রধান বিচারপতি জিজ্ঞাসা করেন, তাঁরা কী চান? দু’পক্ষই নিজেদের সম্পত্তির ভাগ চান। সম্পর্ক নষ্ট না করতে পরামর্শ দেন প্রধান বিচারপতি। তিনি দু’জনের ছোটবেলার সম্পর্কের কথা স্মরণ করতে বলেন, যখন বাবা-মা তাদের এক সঙ্গে বড় করেছেন। বাড়িটি মাঝ বরাবর সীমানা দিয়ে ভাগ করা হলেও ঝগড়া চলবে বলে তিনি মত দেন। যা দুই পরিবারের সন্তানদের উপরেই প্রভাব ফেলবে। দুই ভাই জানান, বাড়ি বিক্রি করে ৪০ লক্ষ টাকার মতো মিলতে পারে। শেষে প্রধান বিচারপতি জানান, দু’জনে মিলে বাড়ি বিক্রি করুন। যে টাকা আসবে, দুই ভাই তা ভাগ করে নিন। তা দিয়ে দুই জন আলাদা জায়গায় বাড়ি করুন। মঞ্চে ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী, রাজ্য লিগাল এইড সার্ভিস অথোরিটির চেয়ারপার্সন ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়, শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের সভাধিপতি তাপস সরকার। তাঁরাও প্রধান বিচারপতির কথা দুই ভাইকে বুঝিয়ে দেন। এর পরে সকলের সামনেই দুই ভাই সেটা মেনে নেন। তখন মঞ্চেই প্রধান বিচারপতি তাঁদের দিকে মিষ্টির পাত্র এগিয়ে দিয়ে ঝাগড়া ভুলে পরস্পরকে খাইয়ে দিতে অনুরোধ করেন। এত দিনের বিবাদ ভুলে দুই ভাই এক জন আর এক জনকে মিষ্টি খাইয়েও দেন। তা দেখে দর্শকাসনে বসে থাকা সকলেই হাততালি দিয়ে ওঠেন।

Advertisement

এ দিন অবশ্য অপর কোনও ব্যক্তিদের সমস্যা মীমাংসার জন্য ছিল না। তবে প্রত্যন্ত চম্পাসারি এলাকায় প্রতি সপ্তাহে শিবির করে লোক আদালতের মাধ্যমে এ ধরনের মামলাগুলি মেটাতে বলা হয়। এ দিন উপস্থিত ছিলেন চম্পাসারি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সঙ্গীতা চিক বরাইক। কাকলি থাপা, গোমা শর্মার মতো পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যরা। তাঁরাও বলেন, ‘‘লোক আদালতের মাধ্যমে এ ধরনের সমস্যার মীমাংসা হলে বাসিন্দারা উপকৃত হবেন। আমাদের কাছেও অনেকে সমস্যা নিয়ে আসেন। বহু ক্ষেত্রেই পরে পুলিশে অভিযোগ করতে হয়। বিবাদ চলতে থাকে, থামে না।’’

রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ, ইন্ডিয়ান ইন্সস্টিটিউট অব লিগাল স্টাডিজ এবং মহকুমাশাসকদের দফতর যৌথভাবে মহকুমার চম্পাসারি গ্রাম পঞ্চায়েত ‘দত্তক’ হিসাবে নিয়েছে সেখানে সমস্ত রকম আইনি পরিষেবা দিতে। এবং আদালতের বাইরে পুরনো মামলাগুলি ‘অলটারনেট ডিসপিউট রেজুলিউশন মেকানিজম’ পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি ঘটাতে। ২৯টি গ্রাম নিয়ে ওই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এ দিন জানান, ১৭ বছর আগে তিনি যখন মহিশূরে জেলা জজ ছিলেন, একটি পঞ্চায়েত এলাকাকে এ ভাবে দত্তক নেওয়া হয়েছিল। সেখানে তাঁরা ৩ মাসে ১০ হাজার সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করেছিলেন। রাজ্যে প্রথম চম্পাসারি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এ ধরনের কাজ সফল ভাবে করে দেখাতে এ দিন আইআইএলএস-এর ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহীত করেন তিনি। এখানে সফল হলে তাকে মডেল হিসাবে সামনে রেখে রাজ্যের ১৫টি আইন কলেজে, তা করানোর পরিকল্পনার কথাও জানান। ৩ মাসে কী কাজ হল তা দেখতে তিনি ফের আসবেন বলেও জানান মঞ্জুলাদেবী।

পরে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘অনেকেই অবাক হবেন রাজ্যের মধ্যে কেন এখানেই প্রথম এই পরিষেবার কথা ভাবা হয়েছে। মহানগরের বাসিন্দারা সুযোগ-সুবিধা হাতের কাছে পান। তা ছাড়া কোনও সমস্যা হলে কোথায় যেতে হবে, কী করতে হবে, তাঁরা জানেন। কিন্তু, এই সমস্ত প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই তা জানেন না। সে কারণেই এই জায়গাটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। আপনারা রোল মডেল হন।’’ বিচারপতি বাগচীর আশ্বাস , এ ক্ষেত্রে মানুষকে আদালতে যেতে হবে না। আদালত-ই মানুষের কাছে গিয়ে পরিষেবা পৌঁছে দেবে। ন্যায় পাইয়ে দেবে।

আদালতে পড়ে থাকা তাদের বকেয়া মামলাই শুধু নয়, বাসিন্দাদের রেশন কার্ড, আধার কার্ড, বিদ্যুৎ, পানীয় জল পরিষেবা, সাফাই, নিকাশি, পণপ্রথার মতো সমস্যাও ওই পদ্ধতিতে মেটানোর জন্য জানিয়েছেন। ইন্ডিযান ইন্সস্টিটিউট অব লিগাল স্টাডিজের চেয়ারম্যান জয়জিৎ চৌধুরী জানান, দ্রুত, স্বল্প খরচে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে অনেক সমস্যাই যে মেটানো যায়, লোক আদালতেই তা সম্ভব। কলেজের তরফে তাঁরা সমস্ত ধরনের সাহায্য করবেন। জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব বাসিন্দাদের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে ছাত্রছাত্রীদের পরামর্শ দেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement