কাবেরী গঙ্গোপাধ্যায় ও (ডান দিকে) প্রীতি সরকার। নিজস্ব চিত্র।
শিলিগুড়ি শহরে ছোট থেকেই মানুষ হয়েছি। বিধান রোডে আমাদের বাড়ি রয়েছে। বয়স্ক মানুষদের কথা ভেবে শহরে ফুটপাথ ব্যবস্থা করা দরকার। না হলে কেনাকাটা করতে কিংবা নানা কাজে বেরিয়ে রিকশা, অটো, টোটোর ঠেলাঠেলির মধ্যে পড়তে হয়। ট্রাফিক সমস্যার জন্য বয়স্ক বাসিন্দারা যাতায়াত করতে সমস্যায় পড়েন। শহরের বিভিন্ন জায়গায় শৌচালয় থাকলে ভাল হয়। বয়স্ক মানুষদের চিকিৎসার প্রয়োজন সব চেয়ে বেশি। শহরে অনেক নার্সিংহোম রয়েছে। কিন্তু সেগুলির মাত্রাতিরিক্ত খরচ। অনেক ক্ষেত্রেই খরচের কোনও নিয়ম নেই। তাতে অনেক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষেও ওই সমস্ত নার্সিংহোমে একটু ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অনেক সময় সম্ভব হয় না।
উপরন্তু, সরকারি হাসপাতালে বয়স্করা গেলে বাড়ি কোনও সুবিধার ব্যবস্থা নেই। ভিড়ের মধ্যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরে যদি শোনা যায়, ডাক্তার আসবে না, ওষুধ নেই তা হলে মুশকিলের ব্যাপার। সরকারি হাসপাতালে অসহায় বৃদ্ধবৃদ্ধাদের পরিষেবা দিতে পৃথক ব্যবস্থা রাখা উচিত। নার্সিংহোমের খরচও কমানো দরকার। শুধু তাই নয়, ষাটোর্ধদের জন্য যেখানে রেলের মতো মন্ত্রক ছাড় দিচ্ছে, সেখানে অন্যান্য বিভাগেও চালু হওয়া দরকার। এমনকী, ‘সিনিয়র সিটিজেন’দের থেকে নামী চিকিৎসকরা যাতে ফি কম নেন সেটাও চিন্তাভাবনা করা উচিত।
এখন ‘নব বসন্ত’ নামে বয়স্ক মানুষদের জন্য একটা বৃদ্ধাবাসে রয়েছি। এটা চালু করার সময়ে আমাকে দেখভালের জন্য কর্মকর্তারা অনুরোধ করায় তখন আর ফেলতে পারিনি। এখন এই বৃদ্ধাবাসেদর দেখভালের কাজে যুক্ত রয়েছি। এই সেবার আদর্শটা অল্প বয়স থেকেই আমাদের পরিবারে ভাইবোনদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল বাবা বসন্ত কুমার সরকারকে দেখে। নানা সমাজ সেবামূলক কাজে তিনি যুক্ত থাকতেন। আমার মনে হয় সকলের মধ্যেই সেই মানসিকতা গড়ে ওঠা খুব দরকার। মানুষের জন্য কাজ করতে পারলে যে আনন্দ রয়েছে তা অন্য কিছুতেই নেই।
এই বৃদ্ধাশ্রমে বর্তমানে ৩ জন মহিলা-সহ ১১ জন এখন রয়েছেন। নিজের বাড়ির মতোই যাতে তাঁরা এখানে কাটাতে পারেন সেইটাই লক্ষ্য। বই পড়া থেকে বাগান করা, খাবার ব্যবস্থা, শরীর চর্চা সমস্ত ব্যবস্থাই করা হয়। শরীর চর্চার জন্য এক শিক্ষিকা আসতেন। ইদানীং তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আসছেন না। তবে শীঘ্রই আসা শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন। আগে বাগান করা হতো। আমি রামকৃষ্ণ সারদামণি বিদ্যাপীঠ প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে আবসর নেওয়ার পর এখন পেনশন পাই। তা থেকেই এখানে থাকার খরচ আমিই নিজেই দিয়ে থাকি। এখানকার প্রয়োজনেও নিজের জমানো টাকা খরচ করি। পর্দা কেনা থেকে ফুলের গাছ কেনা। গত বছর পুজোয় সকলকেই নতুন পোশাক কিনে দিয়েছি। সকলকে সামিল করেই আনন্দ। হল ঘরে পুজো পাঠও কেউ করতে পারেন। আমি নিজেও করি। আবার যোগ চর্চার শিক্ষিকা এলে এখানেই মাদুর পেতে সবাই যোগ ব্যায়াম অভ্যাস করেন।
শহরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেবামূলক কাজে যুক্ত। আরও বেশি মানুষকে ওই কাজে যুক্ত করতে হবে। ছোট বেলায় আমরা খুব কষ্টে বড় হয়েছি। রামকৃষ্ণ ব্যায়াম সমিতিতে লাঠি খেলা, ছুরি খেলা অনুশীলন করতাম। পরবর্তীতে সেন্ট জনস অ্যাম্বুল্যান্স, ভারত স্কাউট অ্যান্ড গাইড সংস্তার হয়েও কাজ করেছি। বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় গরিব মানুষদের খুঁজে বার করতাম। কাদের কী কী প্রয়োজন। সেই মতো বিভিন্ন সংস্থা, ক্লাব সাহায্য করতে চাইলে তাদের নাম ঠিকানা দিতাম। অনেক দুঃস্থ মায়েরা রয়েছেন। তাদের সাহায্য করতে ব্যবস্থা করা হতো। রামকৃষ্ণ ব্যায়াম সমিতির হয়ে দুঃস্থ বাসিন্দাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় সেই কাজে যুক্ত ছিলাম। এখনও চেনা পরিচিতদের সঙ্গে কথা হলেই মানুষের সেবার কাজ করতে তাদের বলি।
প্রীতি সরকার, প্রাক্তন শিক্ষিকা
অনিশ্চয়তার চেয়ে এই বেশ ভাল
শরিকি বিবাদের জেরে বাড়িঘর ছেড়ে বৃদ্ধাবাসে এসেছি। মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। ওরা মাঝেমধ্যে যোগাযোগ করে। স্বামীর সঙ্গেই এসেছিলাম এখানে। উনি মারা গিয়েছেন। গোড়ায় মনটা খারাপ হয়ে যেত। এখন সকলের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। সকালে উঠেই সারা দিনের ভাবনা ভাবতে হয় না। এখন নিজেকে নিশ্চিন্ত মনে হয়। অনিশ্চয়তার জীবন কারই বা ভাল লাগে। এখন ভোর ৫টার আগেই ঘুম থেকে উঠি। ৬২ জন আবাসিকের জন্য শৌচাগার মাত্র হাতে গোনা। তাই সবার আগে না উঠলে পরে অনেক দেরি হয়ে যায়। স্নান সেরে নিই। এর পরে প্রাতঃরাশ সেরে নানা কাজে কাজে সাহায্য করি। বাগানের কাজেও সহযোগিতা করে থাকি। নিজেদের কাজ নিজেই করে নিতে হয়। তাতেই সময় কেটে যায়। দুপুরের খাবার পর কখনও বিছানায় গড়িয়ে নেওয়া। সন্ধ্যার পর শুধুই গল্প। এ ওর পিছনে লাগা। এ ভাবেই চলে যায় রোজকার দিন। তবে বিশেষ দিনে রুটিন পরিবর্তন হয়। কখনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবার কখনও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে বর্ণময় হয়ে ওঠে বৃদ্ধাবাস। দল বেঁধে পুজো দেখা কিংবা ঘুরতে যাওয়াও হয়। বাড়ির কথা মনে পড়ে। কিন্তু, এমন উপদ্রবহীন তো সে জায়গাটা নয়।
আরও একটা কথা। আমি গান ভালবাসি ছোটবেলা থেকেই। এখনও আশ্রমের অনুষ্ঠানে গান গাইতে হয়। উত্তরবঙ্গ উৎসবেও গেয়েছি। তবে বৃদ্ধবৃদ্ধাদের জন্য শিলিগুড়ির মতো বড় শহরে চিকিৎসা, বিনোদনের পরিকাঠামো আরও উন্নত হওয়া দরকার।
কাবেরী গঙ্গোপাধ্যায়, বৃদ্ধাবাসের আবাসিক