কৃষি দফতরের মুড়ি প্যাকেট। নিজস্ব চিত্র।
এক কাপ চা এবং খানিকটা মুড়ি সাত সকালে অনেকেরই বেশ পছন্দ। অল্প ক্যালরির পেট ভরানোর খাবার হিসেবে মুড়ির জুড়ি নেই। শিলিগুড়ি শহর এবং গ্রামীণ এলাকায় এখনও রবিবার বা ছুটির দিনগুলিতে আলাদা করে মুড়ির বাজারও বসে। অফিসে বা বাড়িতে বসে কাজ সময় মুড়ি অনেকেরই মন ভরিয়ে দেয়। আবার তাতে চানাচুর বা ঝুড়িভাজা, শসা কুচি-কাঁচা লঙ্কা হলে তো কথাই নেই। চিকিৎসকদের পরামর্শে আবার অনেকে ওজন কমাতে বা পেটের রোগ সারাতে শুকনো মুড়ি বা জল মুড়ি খেয়ে থাকেন। বাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বহু সংস্থা প্যাকেটজাত মুড়িও বাজারে ছেড়েছে। আর তা দেখেই এবার সরাসরি ধান চাষিদের নিয়ে বিকল্প আয়ের জন্য প্যাকেটজাত মুড়ি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতে উদ্যোগী হয়েছে কৃষি দফতর।
শিলিগুড়ি মহকুমার ফাঁসিদেওয়া ব্লকে কৃষি দফতর চাষিদের দিয়েই প্যাকেটজাত মুড়ি তৈরি করেছে। ধানের বীজের নামেই নামকরণ করা হয়েছে ‘সোনামুখী মুড়ি’। ২৫০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম এবং ১ কেজি তিনটি প্যাকেটের মুড়ি বাজারে পৌঁছানো শুরুও করেছে। ভাল লাভের মুখ দেখায় মহকুমা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাষিরা ইতিমধ্যে কৃষি দফতরের অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছেন। আপাতত ঠিক হয়েছে, আগামী ২৮ নভেম্বর শনিবার ফাঁসিদেওয়া সদর লাগোয়া ঘোষপুকুর এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে সোনামুখী মুড়ি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী পুর্ন্দেন্দু বসু।
শিলিগুড়ি মহকুমার অন্যতম সহ কৃষি অধিকার্তা মেহফুজ আহমেদ বলেন, ‘‘নিত্যনতুন চাষের পদ্ধতি বা চিন্তাভাবনার মাধ্যমে চাষিদের আর্থিক বিকাশ দরকার। প্যাকেটের মুড়ি তৈরি তারই ফসল।’’ সহ কৃষি অধিকর্তা জানান, গ্রামীণ এলাকাগুলিতে সাধারণ কয়েকটি আমন ধান তো বটেই নাগেশ্বরী ধান থেকে চাল করে মুড়ি তৈরি হয়। কিন্তু ওই সব ধানের উৎপাদন কম। তাই বেশি উৎপাদনের সোনামুখী ধানের বীজ দিয়ে আমরা প্রকল্পটি করেছি। আর রাসায়নিক বা রং ছাড়া তৈরি মুড়ির বাজারে চাহিদা সব সময় বেশি। প্রতিটি প্যাকেটে ফার্মাস ক্লাব ও কৃষি দফতরের উদ্যোগের কথা ছাপানো থাকছে।
কৃষি দফতর সূত্রের খবর, চলতি বছরের জুলাই মাসে ফাঁসিদেওয়ার নয়াহাট, ছোট হাফতিয়াগছ, ফোটামারি, হেলাগছ-সহ পাঁচটা এলাকার ফার্মাস ক্লাবের চাষিদের ২০০ বিঘা জমিতে চাষের জন্য সোনামুখী ধনের বীজ দেওয়া হয়। নভেম্বর মাসের প্রথম থেকে ধান কেটে ঘরে পৌঁছাতেই চাষিরা চাল তৈরি করেছেন। গরম বালিতে ধানে তাপ দিয়ে মুড়ি তৈরি হয়। প্রথাগত ভাবে ছাড়াও বাজারে আসা মেশিন দিয়েও তা হয়।
এই সময় অনেকক্ষেত্রে সাদা ফটফটে, ফোলা মুড়ির জন্য ইউরিয়া, সোডা বা রং মেশানো হয় বলে অভিযোগ। যা শরীরের পক্ষে ভাল নয়। সোনামুখী মুড়িতে তার ছিঁটেফোঁটাও নেই বলে কৃষি দফতরের অফিসারেরা জানিয়ে দিয়েছেন। তিন রকমের প্যাকেটের দাম করা হয়েছে ৮০ টাকা কেজি। ২৫০ গ্রামের প্যাকেটের দাম রাখা হয়েছে ২০ টাকা।
দফতরের অফিসারেরা জানান, ১ একর জমিতে সোনামুখী দান মেলে ১২৮০ কেজি। সেখানে নাগেশ্বরী বা অন্য ধান সাধারণত মেলে ৮০০ কেজির মত। ওই পরিমাণ সোনামুখী থেকে চাল হয়, ৮০০ কেজি। সবশেষে মুড়ি হয় ৪৮০ কেজি’র মত। ধানের এবং প্যাকেজিং মিলিয়ে খরচ পড়ে একর প্রতি ৫ হাজার টাকা। মুড়ি ৬০ টাকা কিলো দরে বিক্রি করলেও মিলছে ২৮,৮০০ টাকা। লাভ প্রায় ২৩ হাজার টাকার মত। সেখানে ওই পরিমাণ ধান বিক্রি করে মেলে ১৩ হাজার টাকার মত। আবার চাল হলে তার দাম ২০-২২ টাকা কেজির বেশি কোনওভাবেই নয়। তাই মুড়ির বাজার ধরতে পারলে চাষিদের লাভ নিশ্চিত।
ছোট হাফতিয়াগছের মহম্মদ সফিদুল বা ফোটামারির আসারুল ইসলামের মত ধান চাষিরা জানান, ধান ছাড়াও নাগেশ্বরী দিয়ে মুড়ি তৈরি করেছি। কিন্তু ওই ধানের ফলন কম থাকায় লাভ বেশি হয় না। সেখানে সোনামুখী একই রকম। লাভও বেশি হচ্ছে। তবে কৃষি দফতরের বীজ বা প্রশিক্ষণ না থাকলে সম্ভব হত না। সরকারি মেলা, অনুষ্ঠানে তো মুড়ি যাবেই। ইতিমধ্যে পাইকার বা বড় মুড়ি ব্যবসায়ীরাও যোগাযোগ করে প্যাকেটমুড়ি নেওয়া শুরু করে দিয়েছেন। আগামী বছর অনেকেই এই পথে হাঁটবে।