চলতি মাসে উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ দুধ সরবরাহী সংস্থা হিমূলের কর্মী অফিসারেরা এখনও বেতন পাননি। এরই মধ্যে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ভোটের ডিউটি করা নিয়ে হিমূলের কর্মীদের সঙ্গে প্রশাসনিক আধিকারিকদের চাপান-উতোর শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, সপ্তাহ খানেক ধরে দফায় দফায় ওই কর্মীদের ভোটের ডিউটিতে যাওয়ার সরকারি নির্দেশনামা পাঠানো হলেও তাঁরা তা নিতে অস্বীকার করেছেন। এই অবস্থায় ভোটের ডিউটিতে না গেলে তাঁদের শোকজ করা ছাড়াও সমন বার হতে পারে বলেও নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর।
হিমূলের ওই কর্মী-অফিসারদের বক্তব্য, গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে আর কোনও বেতন মেলেনি। সম্প্রতি কর্মীদের ৫ হাজার টাকা করে অগ্রিম নেওয়ার কথা বলা হয়। মাত্র ২৫ জনের মত তা নিয়েছেন। পরবর্তীতে বেতনের সঙ্গে ওই টাকার হিসেব করা হবে বলে জানানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ কর্মী-অফিসার তাতে রাজি হননি। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিটি পরিবারই তীব্র আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। নিজেদের গচ্ছিত টাকা দিয়ে কোনওক্রমে সংসার চলছে। বেশিদিন তাও চলবে না। এই অবস্থায় বেতন না পেয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে ভোটের ডিউটি করতে বলাটা অমানবিক ছাড়া কিছুই নয়।
শুক্রবারও ভোটের কাজে যেতে চান না বলে একযোগে সংস্থার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিককে (সিইও) জানিয়ে দিয়েছেন। হিমূলের সিইও পেম্বা শিরিং শেরপা বলেন, “নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ওই অফিসার কর্মীদের ভোটের ডিউটিতে যেতেই হবে। এ ক্ষেত্রে কোনও কিছু করার নেই। যাবতীয় সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের। কর্মীরা আপত্তির কথা জানিয়েছেন। আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সব জানিয়েছি।” তবে হিমূলের গোখাদ্য প্রস্তুতকারক কারখানা থেকে কিছু টাকা তুলে পাঁচ হাজার টাকা করে কর্মীদের নিতে বলা হলেও অধিকাংশই তা নেননি বলে সিইও জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, পাহাড়, সমতল মিলিয়ে হিমূলের স্থায়ী ১৩৫ জন কর্মীর মধ্যে ৭১ জন কর্মীকে ভোটের কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা প্রতিটি নির্বাচনে এর আগে হিমূলের কর্মীরা সরকারি কাজে অংশ নিয়েছেন। এবারই বেতন না পেয়ে তাঁরা বেঁকে বসেছেন। এই অবস্থায় সমস্যায় পড়েছেন প্রশাসনিক অফিসারেরা। একেবারে ভোটের শেষ সময়ে ওই সংখ্যক লোক অন্য কোনও জায়গা থেকে পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেবে বলে প্রশাসনিক আধিকারিকেরা জানিয়েছেন। আগামী ১৭ এপ্রিল রাজ্যে প্রথম দফায় দার্জিলিং, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার এবং জলপাইগুড়ি লোকসভা আসনে ভোট হবে।
প্রশাসনের একাংশ অফিসারদের বক্তব্য, “হিমূলের কর্মীরা বেতনের কোনও টাকা পাননি তা ঠিকই। কিন্তু তাঁদের জন্য কিছু টাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যা তাঁরা নিতে চাইছেন না। আবার ভোটে ডিউটিতে গেলেও তাঁরা কিছু টাকা পেতেন, তাও কাজে না গেলে পাবেন না। উল্টে, শোকজ, সমন-সহ নানা সমস্যায় পড়েন যাবেন।” সরকারি সূত্রের খবর, এবার ভোটের প্রিসাইডিং অফিসারেরা ১৮০০ এবং পোলিং অফিসেরারে ১১৫০ টাকার মত পাবেন। তবে হিমূলের কর্মীদের আশঙ্কা, “এখন ৫ হাজার নিলে এটা সংস্থার প্রথায় দাঁড়িয়ে যাবে। আগামী দিনে পুরো বেতন না দিয়ে এইভাবে কিছু টাকা দেওয়া শুরু হয়ে যেতে পারে। উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমে যা হয়েছে। সেই ভয়েই অধিকাংশ কর্মীরা টাকা নিতে চাইছেন না।”
এই প্রসঙ্গে শিলিগুড়ির প্রাক্তন বিধায়ক তথা সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্য বলেন, “আমরা হিমূলের সমস্ত কিছুই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্রকে জানিয়েছি। তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিচ্ছেন। আর বেতন না পেয়ে, না খেয়ে ভোটের কাজ করাটা সত্যিই অমানবিক।”
হিমূল সূত্রের খবর, বেতন সংক্রান্ত সমস্যা চললেও হিমূলের অবস্থাও এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি। বিকেলে ২-৩ হাজার লিটার দুধ প্যাকেটজাত করে ছাড়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিহার থেকে আনা ৪০ হাজার লিটার দুধ সংস্থায় মজুত হয়েছে। যা দিয়ে আগামী ১-২ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। সংস্থার গোখাদ্য কারখানা থেকে টাকা তুলে ওই দুধ আনা হচ্ছে। সিইও বক্তব্য, “দুধ বিক্রি করে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমরা কর্মীদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা করব।” চলতি মাসের শুরু থেকেই হিমূলের এই অচলাবস্থা চলছে।