বিরোধীরা মিশে, তৃণমূলে নতুনরা বেশি

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শুরু হতেই বিরোধীদের ‘মিলেমিশে’ থাকার ছবিটা ধরা পড়েছে এলাকার অনেকেরই চোখে। দুপুরের চাঁদিফাটা রোদ। ফাঁসিদেওয়া বিএড কলেজের সামনে পরপর ছোট-বড় গাড়ির লাইন। কোনওটায় ‘লাল’ পতাকা। আবার কোনওটায় ‘হাত’ চিহ্নের পতাকা। লোকজন যেন মিলেমিশে রয়েছেন।

Advertisement

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০২:০৯
Share:

ভোটের মুখে। (উপরে) ফাঁসিদেওয়ায় কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের গ্রেফতার করায় ক্ষোভ। (নীচে) তৃণমূলের মিছিল। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শুরু হতেই বিরোধীদের ‘মিলেমিশে’ থাকার ছবিটা ধরা পড়েছে এলাকার অনেকেরই চোখে। দুপুরের চাঁদিফাটা রোদ। ফাঁসিদেওয়া বিএড কলেজের সামনে পরপর ছোট-বড় গাড়ির লাইন। কোনওটায় ‘লাল’ পতাকা। আবার কোনওটায় ‘হাত’ চিহ্নের পতাকা। লোকজন যেন মিলেমিশে রয়েছেন। গল্পগুজব, ডাকাডাকি, কাগজপত্র পরীক্ষা একযোগেই চলছে। কিছুক্ষণ পর একে একে গাড়ি বোঝাই করে কংগ্রেস, সিপিএম নেতারা ব্লক অফিসে দিয়ে মনোনয়ন জমা দেওয়া শুরু করলেন। আবার একযোগে মিছিলের এক-আধটা ছবিরও দেখা মিলেছে। আদিবাসীদের কোনও গোষ্ঠীর কেপিপি, বিজেপি পতাকা উড়তে দেখা ছোট গাড়ি ও বাইকের দেখাও মিলেছে আশেপাশেই। সবাই ব্যস্ত প্রার্থীদের নিয়েই।

Advertisement

এর খানিকটা দূরে, বিডিও অফিস সংলগ্ন মাঠে অবশ্য শাসক দলের শিবিরে অন্য দৃশ্য। চারদিকে বাস, ছোটগাড়ি, অটো-বাইকের ঠেলাঠলি। প্রত্যেকটির সামনে উড়ছে ঘাসফুলের পতাকা। কোনওটায় আবার প্রার্থীর নাম দেওয়া, প্রতীক দেওয়া ফ্লেক্সও। রাস্তায় দুইধারে লোকজনের ভিড়, ঠান্ডা পানীয়ের বোতল, গলার স্বর সবই বুঝিয়ে দিচ্ছে শাসক দলের অলিখিত ক্যাম্প রমরমিয়ে চলছে। কিন্তু পুরানো তৃণমূলের থেকে ‘নব্য’ তৃণমূলীদের ভিড়টাই বেশি চোখে পড়ছে। এদের মাঝেই আদিবাসী কয়েকজন নেতার ইতিউতি ঘোরাফেরা করতেও দেখা গেল। তবে গত কয়েক বছরে দলযোগ দেওয়া নেতাদের দাপটই বেশি।

দার্জিলিং জেলায় সমতলে চিরাচরিত কংগ্রেসের ‘শক্ত ঘাঁটি’ বলে পরিচিত ফাঁসিদেওয়ার এখন ‘হযবরল’ শব্দটা এখন আকাশে বাতাসে ভাসছে। নিচুতলায়, নিঃশব্দে। গত কয়েক বছরে মহকুমা পরিষদ থেকে পঞ্চায়েত সমিতি, গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরেও ভাঙন ধরেছে কংগ্রেসে। পুরানোদের অনেকে ভিড় এখন সবই প্রবল হাওয়ায় উড়ে থাকা ঘাসফুলের শিবিরে। সেখানে দলে থেকে যাওয়া নেতা, কর্মীদের নিয়ে ভরসা করে লড়াইকে ব্যস্ত কংগ্রেস নেতৃত্ব। আর শাসকের বিরুদ্ধে এই লড়াই-এ তাই কংগ্রেসের পাশে দেখা যাচ্ছে অনেক জায়গায় সিপিএমের মতো বাম দলকে। আবার কখনও আদিবাসীদের কোনও গোষ্ঠীকেও।

Advertisement

স্থানীয় কংগ্রেস, সিপিএম নেতারা জানান, গত কয়েক বছরে ফাঁসিদেওয়া জুড়ে জবরদখল, লুঠ হয়েছে মহকুমা পরিষদ, পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতিগুলি। কোথাও ভোটে জেতেনি তৃণমূল। ক্ষমতার অপব্যবহার চলছে। তাই কিছু জায়গায় প্রার্থী মেলেনি। পুলিশ-প্রশাসন বিরুদ্ধে রয়েছে। তাই কিছু কিছু জায়গায় অনেককে নিয়ে গণপ্রতিরোধের জায়গা তৈরি করা হয়েছে। ফাঁসিদেওয়া, চটহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো এলাকা এক্ষেত্রে রাস্তা দেখাচ্ছে।

জেলা কংগ্রেস সভাপতি শঙ্কর মালাকার বা ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রদেশ কংগ্রেসের সম্পাদক সুবীন ভৌমিক বলেছেন, ‘‘ফাঁসিদেওয়ার মানুষ কংগ্রেসের পাশে আছে। তাই এখনও এলাকার স্কুল নির্বাচনগুলিতে আমরা জিতি। আমরা সাধ্য মতো লড়াই করছি। আর তৃণমূল জবরদখলের রাজনীতি করত। এ বার ভোটে জেতার চেষ্টা করবে। সেখানে পুলিশ, অর্থ, ক্ষমতা সবই ব্যবহার হচ্ছে।’’

জেলা সিপিএম সম্পাদক জীবেশ সরকার বা দলের রাজ্য সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য অশোক ভট্টাচার্য খোলাখুলিভাবে বলছেন, ‘‘আমরা ভোট লুঠ ঠেকাতে সবাইকে একযোগে ডাক দিয়েছি। তৃণমূলকে কোনও ভোট না দেওয়ার কথা বলছি। তাতে কেউ আমাদের হযবরল বললেও আপত্তি নেই।’’

সমতলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্লক ফাঁসিদেওয়া। সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েত, একটি পঞ্চায়েত সমিতি এবং তিনটি মহকুমা পরিষদের আসন রয়েছে। এর মধ্যে গতবার ফাঁসিদেওয়া, চটহাট, বিধাননগর-১ পঞ্চায়েত কংগ্রেসের দখলে ছিল। জালাস, ঘোষপুকুর সিপিএমের দখলে আর বিধানননগর-২, হেটমুড়ি সিঙ্গিঝোরার মতো পঞ্চায়েতগুলিতে মিলেমিশে ছিল বিকাশ পরিষদ, কংগ্রেস বা কেপিপি’র মতো দল। পঞ্চায়েত সমিতি থেকে গতবারের দুটি মহকুমা পরিষদ আসন সবই কংগ্রেসের দখলে ছিল। এলাকায় বিধায়কও কংগ্রেসের। তবে গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে ‘বদল’ শুরু হয়। কংগ্রেসে ভাঙন ধরিয়ে পঞ্চায়েত সমিতি থেকে তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত শেষ অবধি ‘দখল’ করে তৃণমূল।

তাই এবার তৃণমূলে ‘ভোটে’ জেতার লড়াই-বলছেন দলের অনেক নেতারাই। তাঁদের অনেকেই জানাচ্ছেন, এবার দল ভোটের লড়াই করছে ফাঁসিদেওয়ায়। সংগঠন এখনও তেমন ভাল নয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গতবারের জয়ী লোকজনকেও প্রার্থী করেই লড়াই করতে হচ্ছে। ৫০টি ছোটবড় চা বাগান রয়েছে। তাই আদিবাসী নেতাকে দলের টিকিট দিতে হয়েছে। বিত্তশালী ব্যবসায়ীদেরও প্রার্থী করা হয়েছে। তবে পুরানো তৃণমূল থেকে নব্যদের ভিড়ই বেশি। দলের মধ্যে এই নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভও রয়েছে। সেগুলি সামাল দেওয়া হচ্ছে। আবার দলের ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অলোক চক্রবর্তী, দীপক শীলেরা বলেছেন, ‘‘আমরা দিনরাত মিটিং, মিছিল করছি। বাম-কংগ্রেসের জোটের বিরুদ্ধে এটা উন্নয়নের প্রশ্নের লড়া‌ই।’’

তবে দলের জেলা সভাপতি আর উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব যেমন বলছেন, ‘‘আমরা যোগ্যদেরই প্রার্থী করেছি। আর শাসক দলের টিকিট পেতে ভিড় বেশি থাকেই। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ব্লকে একাধিক মাইনরিটি হস্টেল, কিসান মান্ডি, মডেল স্কুল-কলেজ হচ্ছে। আমরা ফাঁসিদেওয়ায় ভাল করবই। কংগ্রেসের দুর্গ বলে আর কিছু নেই।’’ এলাকার মানুষের কথায়, রাজনীতির এই চাপানউতরের মধ্যেই গরু পাচার, দুষ্কৃতী তাণ্ডব রুখতে কোন দল কী করছে, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement