এক সময় বাম জমানাতেও রমরমিয়ে উড়ত হাত চিহ্নের পতাকা। গতবার পঞ্চায়েত নির্বাচনে একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে পঞ্চায়েত সমিতি, মহকুমা পরিষদ সব আসনই দখলে গিয়েছিল কংগ্রেসের। এমনকি, ২০১১ সালের জোটের হাওয়ায় ফাঁসিদেওয়া বিধানসভাও দখল করেছিল কংগ্রেস। ২০১৫ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে সব যেন উল্টে পাল্টে গেল। বুধবার দিনভর ফাঁসিদেওয়া বাজারে টিনের শেডের তলায় দলীয় ক্যাম্প করে বসেও কংগ্রেস বিধায়ক থেকে নেতানেত্রীরা ঝুলি কার্যত ফাঁকা নিয়েই ফিরলেন।
এ দিন সন্ধ্যায় ফল প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, ব্লকের কোনও গ্রাম পঞ্চায়েত কংগ্রেস একক ভাবে দখল করতে পারেনি। হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে পঞ্চায়েত সমিতি থেকে মহকুমা পরিষদের আসনগুলিও। কোথাও সিপিএম আবার কোথাও বা তৃণমূল থাবা বসিয়েছে কংগ্রেসের চিরাচরিত ভোট ব্যাঙ্কে। এই অবস্থায় ফাঁসিদেওয়ায় আগামী দিনে কংগ্রেস কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়েও দলের একাংশের মধ্যেই সংশয় দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি, আগামী বিধানসভা ভোটেও আসনটি দল ধরতে রাখা মুশকিল বলেই এদিনের পর জেলা কংগ্রেস নেতারা অনেকেই পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।
এই প্রসঙ্গে জেলা কংগ্রেস সভাপতি তথা বিধায়ক শঙ্কর মালাকার বলেন, ‘‘তৃণমূল তো এ বারই ভোটে প্রথম লড়ল। আগে তো তৃণমূল কংগ্রেসকে জবরদখল করে গিয়েছে। আমরাও সংগঠনকে ঠিকঠাক ধরে রাখতে পারিনি। আবার ভোটে কংগ্রেস, তৃণমূলের ভোট কাটাকাটির ফসল সিপিএম বাড়ি নিয়ে গেল।’’
দলের অন্দরের খবর, ভোটের আগে পর্যন্ত দলত্যাগের হিড়িক, নেতৃত্বের দুর্বলতার অভাবেই দলকে নিজের একসময়কার ‘ঘাঁটিতে’ মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে। এ ছাড়াও গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতির স্তরে ‘অলিখিত জোটে’র বোঝাপড়ার ফল সিপিএম যে ভাবে ঘরে তুলেছে তা অনেকটাই কংগ্রেসের হাতের বাইরেই থেকেছে। তেমনই, মহকুমা পরিষদ স্তরে কোনও বোঝাপড়া না হওয়ায় কংগ্রেস পরিষদ স্তরে কার্যত একাই লড়েছে।
ভোটের আগে এবং এদিন একযোগে মিছিল হলেও ভোটের বাক্সে তার প্রভাব সেভাবে পড়েনি, তা পরিষ্কার। অনেক জায়গাতেই সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি-র মধ্যে ভোট কাটাকাটিতে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে দল। তাই ব্লকের তিনটি পরিষদের আসনের মধ্যে দুটিতে তৃণমূল এবং একটি সিপিএম প্রার্থী জিতেছেন। সেই সঙ্গে নিচু তলায় আদিবাসী বিকাশ পরিষদের বিভিন্ন গোষ্ঠী, জনমুক্তি মোর্চা, কেপিপি, ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চার মতো দলগুলির সঙ্গেও দলের আলোচনা হলেও বোঝাপড়ার বড় ঘাটতি যে ছিলই, তা ফলাফলেই কংগ্রেস নেতাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।
সমতলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্লক ফাঁসিদেওয়া, প্রায় ৩০৯ বর্গ কিলোমিটার। সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েত, ২১ আসনের একটি পঞ্চায়েত সমিতি রয়েছে। এর মধ্যে গতবার ফাঁসিদেওয়া, চটহাট, বিধাননগর-১ পঞ্চায়েত কংগ্রেসের দখলে ছিল। জালাস, ঘোষপুকুর সিপিএমের দখলে আর বিধানননগর-২, হেটমুড়ি সিঙ্গিঝোরার মতো পঞ্চায়েতগুলিতে মিলেমিশে ছিল বিকাশ পরিষদ, কংগ্রেস বা কেপিপি’র মতো দল। পঞ্চায়েত সমিতি থেকে গতবারের দুটি মহকুমা পরিষদ আসন সবই কংগ্রেসের দখলে ছিল। এলাকায় বিধায়কও কংগ্রেসের। তবে গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে ‘বদল’ শুরু হয়। কংগ্রেসে ভাঙন ধরিয়ে পঞ্চায়েত সমিতি থেকে তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত শেষ অবধি ‘দখল’ করে তৃণমূল। মহকুমা পরিষদের দুই কংগ্রেস সদস্যও শাসক দলে নাম লেখান। এবার অবশ্য পরিষদ আসন ছিল তিনটি।
ফলাফল বার হওয়ায় পর দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেসের দখল থাকা ফাঁসিদেওয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূল এক নম্বরে (৭টি আসন) রয়েছে। কংগ্রেস দ্বিতীয় স্থানে (৫টি আসন)। তেমনই চটহাটে ১১টি তৃণমূলের দখলে গিয়েছে। ৪টি আসন মাত্র এসেছে কংগ্রেসের ঘরে। আবার বিধাননগর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতে কংগ্রেস শূন্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে তৃণমূলই পেয়েছে ১০টি আসন। আবার হেটমুড়ির মতো বিরাট পঞ্চায়েতে ১টি আসনেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে দলকে।
আর প্রত্যাশার থেকে অনেক কম জালাস নিজামতারা এবং ঘোষপুকুরে ৭টি করে আসন পেয়েছে দল। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা ফাঁসিদেওয়া পঞ্চায়েত সমিতির তিন নম্বরে চলে গিয়েছে কংগ্রেস। আর মহকুমা পরিষদের তিনটির মধ্যে একটি আসনে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও বাকি দুটি তৃতীয় নম্বরে গিয়ে ঠেকেছে।
প্রদেশ কংগ্রেসের অন্যতম সম্পাদক তথা ব্লকের পর্যবেক্ষক সুবীন ভৌমিক বলেছেন, ‘‘মানুষের প্রত্যাশা আমরা পূরণ করতে পারেনি। দলবদল ঠেকানো, প্রার্থী সব দিকেই ঘাটতি ছিল বলে মনে হচ্ছে। তবে ভোট স্থায়ী নয়, সাময়িক। আগামী দিনে আমাদের আরও কাজ করতে হবে। ফাঁসিদেওয়ায় দলের জায়গায় ফেরাতেই হবে।’’