শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কতৃর্পক্ষের (এসজেডিএ) বহু কোটি টাকার দুর্নীতি মামলায় বোর্ড এবং তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি’র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠল আদালতেই। শনিবার বিকালে এসজেডিএ-র প্রাক্তন সিইও গোদালা কিরণকুমারের ছয়টি মামলার জামিনের আবেদন খারিজ করে, শিলিগুড়ির অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক অজয় কুমার দাস। রায় দিতে গিয়ে বিচারকের পর্যবেক্ষণ, তদন্তকারী সংস্থা দুমুখো নীতিতে চলছে মনে হচ্ছে। কারণ, গোদালাকে কিরণ কুমার যখন প্রথম গ্রেফতার হন, তখন পরদিনই তদন্তকারী সংস্থা জামিনের বিরোধিতা করেনি। সেই কিরণকুমারকেই দ্বিতীয় দফায় গ্রেফতারের পরে তদন্তকারী সংস্থা টাকা উদ্ধারের জন্য তাঁর জামিনের বিরোধিতা করে চলছে। সেই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে এক ইঞ্জিনিয়রের পদাবনতির নির্দেশ দিলেও বোর্ড আইনি ব্যবস্থা নিতে দেরি করেছে বলেও তাঁর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে।
মামলার সরকারি আইনজীবী পীযূষ ঘোষ বলেছেন, ‘‘গোদালা কিরণ কুমারের জামিনের আবেদন খারিজ হয়েছে। আর বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে কী বলেছেন তা রায়ের কপি হাতে পেলেই স্পষ্ট হবে।’’ আবার এসজেডিএ প্রাক্তন সিইও তথা আইএএস অফিসারের আইনজীবী তড়িৎ ওঝা বলেছেন, ‘‘আমার মক্কেলের জামিন খারিজ হয়েছে। তবে আদালতে আমরাও বোর্ড, তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন বারবার তুলছি। বিচারক এই বিষয়ে কী বলছেন, তা রায়ের কপি দেখলেই স্পষ্ট হবে।’’
গত ১৪ এবং ১৫ সেপ্টেম্বর ওই আদালতে দু’দিন টানা মামলার দুই পক্ষের সওয়াল জবাব শোনেন বিচারক। শেষে এ দিন তিনি জামিনের আবেদনে রায় দেবেন বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। সেই মতন এ দিন গোদালার জামিনের সব কটি আবেদন খারিজ করে দিয়ে আট পাতার রায়ে তিনি নানা পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে দিয়েছেন।
জানা গিয়েছে, বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে এক জায়গায় বলেছেন, গত ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর সিসিটিভির মামলায় গোদালা কিরণ কুমারকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু এক দিনের মাথায় ১ ডিসেম্বর তাকে এসিজেএম আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়। সেই সময় তদন্তকারী সংস্থা তথা সরকারি আইনজীবী গোদালার হেফাজত দরকার নেই আদালতে জানিয়ে দেন। কিন্তু এ বার সরকারি আইনজীবী এবং তদন্তকারী সংস্থা টাকা উদ্ধারের জন্য গোদালার হেফাজত প্রয়োজন বলে জানাচ্ছে। ওই মামলার থেকে এখনকার মামলাগুলি সব আলাদা তাও বলা হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি দুর্নীতির মামলাই একই ধরনের। তাই মনে হচ্ছে, কয়েক মাসের মধ্যে তদন্তকারী সংস্থা ‘দ্বিমুখী’ ভূমিকা পালন করছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে সেই সময় গোদালাকে গ্রেফতার করেছিলেন তৎকালীন শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার কারলিয়াপ্পন জয়রামন। তা নিয়ে রাজ্য সরকারের একাংশের নানা সমালোচনার মুখে পড়েন পুলিশ কমিশনার। পরেরদিন, গোদালার জামিন শুধু নয়, জয়রামনকেও বদলি করে দেওয়া হয় শিলিগুড়ি থেকে। তাঁকে ‘কম্পালসরি ওয়েটিং’ পাঠানো হয়েছিল।
এদিন রায়ে বিচারক বলেছেন, এই ধরনের দ্বিমুখী ভূমিকা বন্ধ হওয়া দরকার। তদন্তকারী সংস্থা যদি সঠিক পথে তদন্ত না করে তাহলে দুর্নীতি মামলার বাকি ৫৬ কোটি টাকা উদ্ধার করাই সম্ভব হবে না। এর পরেই তদন্তকারী সংস্থার উদ্দেশ্যে বিচারক বলেছেন, তদন্তকারী সংস্থাকে আদালতকে মান্য করে চলতে হবে। নইল আইনের শাসনের প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়বে।
এ ছাড়াও এসজেডিএ-র বোর্ড নিয়ে পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, আদালতে এসসেডিএ-র সিইও সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি নিয়ে নথি পেশ হয়েছে কিন্তু সেখানে চেয়ারম্যানের কোনও সিল বা স্বাক্ষর নেই। ওই বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সমস্ত ক্ষমতা এবং কর্তব্য এসজেডিএ-র। সেখানে বোর্ড বা অথরিটি সিইওকে যা করতে বলবেন তা তিনি করবেন। মামলার একটি চার্জশিট থেকে দেখা যাচ্ছে, তৎকালীন চেয়ারম্যানের নির্দেশেই ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, সিইও চেয়ারম্যানের নির্দেশে কাজ করেন। এমনকি, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর এক বাস্তুকারকে নিচু পদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত বোর্ড (১১৪ নম্বর মিটিং) নেয়। কিন্তু বোর্ডের পরের মিটিং (১১৫ নম্বর মিটিং) বোর্ড বদল হয়। সেখানে তৎকালীন চেয়ারম্যান-সহ দু’জন বোর্ড সদস্যের নামও ছিল না।
তাদের কেন সরানো হল তা পরিষ্কার নয়। সেই বোর্ডের তরফে দুর্নীতির অভিযোগগুলি পুলিশে অনেক পরে জানানো হয়েছে। সেই সময় চেয়ারম্যান কোনও ব্যবস্থা নেননি। বিচারক পর্যবেক্ষণে বলেছেন, তদন্তকারী সংস্থা সিইও নিজের মত কাজ করেন বললেও নথিপত্র অনুসারে দেখা গিয়েছে, বোর্ডই প্রকল্পের ওয়ার্ক অর্ডার, কাজের খতিয়ান, অ্যাকাউন্টস সব অনুমোদন করে। তাহলে সিইও-র নিজে নিজে সেই সমস্ত কাজ কী করে করতে পারেন তাও দেখা দরকার।