চলতি মাসেই বদলি হয়েছেন সংস্থার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক (সিইও)। নতুন সিইও নিয়োগ হলেও নথিপত্র, সরকারি আদেশনামা ব্যাঙ্কে জমা না পড়ায় আর্থিক লেনদেন আপাতত থমকে রয়েছে ধুঁকতে থাকা উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ প্যাকেটজাত দুধ সংস্থা হিমূলের।
এই পরিস্থিতিতে গত এক মাসে দুধ সরবরাহকারীদের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা। এরমধ্যে বিহারে দুধ সরবরাহের বকেয়া ২০ লক্ষ টাকার মত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দুধ সরবরাহ বন্ধের আশঙ্কা করছেন হিমূলের কর্মী, অফিসারদের একাংশ। তাঁরা জানিয়েছেন, একসময় দুধের লেনদেন নগদে হত, গত বছর কিছু অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠায় তা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। সেখানে সিইও মূলত দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার। তাই নতুন সিইও-র নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র দ্রুত ব্যাঙ্কে জমা করতে হবে।
সরকারি সূত্রের খবর, বুধবার দুপুরে বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর করে কিছু নথিপত্রে তড়িঘড়ি সই করেছেন হিমূলের চেয়ারম্যান তথা জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব। তবে সিইও নিয়োগ ও সই সংক্রান্ত কাগজ এদিনও ব্যাঙ্কে পৌঁছায়নি। তা যাতে দ্রুত ব্যাঙ্কে পৌঁছায় তাঁরও নির্দেশ দিয়েছেন চেয়ারম্যান। জেলাশাসক অবশ্য বলেন, ‘‘হিমূলের নতুন সিইও নিয়োগ হয়েছে। সেই সরকারি আদেশ এসে পৌঁছেছে। কাগজপত্র তৈরি হচ্ছে। সংস্থার আর্থিক লেনদেন সচল রাখতে ব্যাঙ্ককেও জানানো হবে। দুধ যাতে বন্ধ না হয় সেটা দেখা হবে।’’
উল্লেখ্য, হিমূলের সিইও ছিলেন জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি ও ভূমি সংস্কার) রচনা ভকত। চলতি মাসেই তিনি বদলি হয়েছেন। তাঁর বদলে অতিরিক্ত জেলাশাসক পদে যোগ দিয়েছেন কার্শিয়াঙের প্রাক্তন মহকুমা শাসক ইউ স্বরূপ। তাঁকেই হিমূলের সিইও পদে নিয়োগ করেছে রাজ্য সরকার।
হিমূল সূত্রের খবর, বাম আমলে বেহাল হয়ে পড়া হিমূল গত কয়েক বছর ধরে আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। প্রায় ১ লক্ষ লিটার উৎপাদন ক্ষমতার হিমূলের উৎপাদন ক্ষমতা এসে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার লিটারে। সরবরাহকারীদের বকেয়া না মেটাতে পারায় দুধ সরবরাহ গত এক বছরে বেশ কয়েকবার দফায় দফায় বন্ধও হয়েছে। ১৯৯১ সালে দুধের অভাবে একইভাবে প্রায় ২ মাস হিমূল বন্ধ ছিল। কোনও সময় একবেলা দুধ বাজারে এসেছে। গত বছরের শুরুতে দুধ সররবাহের বকেয়া প্রায় ১ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকায় এসে দাঁড়ায়। গত বছর সরকার পিএফ, বিদ্যুৎ বিল, সরবরাহকারীদের বকেয়া মিলিয়ে ৩ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা দেয়। এ ছাড়া প্রতিমাসে ২০ লক্ষ টাকা দৈনন্দিন খরচের জন্য দেওয়া শুরু হয়।
এর আগে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে ৫ কোটি টাকার মত দিয়েছিল হিমূলকে। টাকা সঠিক সময় না দেওয়ায় পাঁচটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও বন্ধ করেছিল পিএফ কতৃর্পক্ষ। সেবার প্রাণী সম্পদ বিকাশ দফতর থেকে ৬৭ লক্ষ টাকা জমা দিয়ে তা খোলা হয়। কিন্তু ফের ২৯ লক্ষ টাকা বকেয়া পড়ায় এখনও অ্যাকাউন্টগুলি বন্ধ রয়েছে। তা খুলতে প্রতিমাসের খরচ বাবদ বরাদ্দ থেকে টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনও এই সংস্থা মাসে প্রায় ১৫-২০ লক্ষ টাকা লোকসানে চলছে। এই অবস্থায় সিইও বদলে হতেই ফের আর্থিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।
গত দেড়মাস আগেও রোজ ১১ হাজার লিটারের মত দুধ প্যাকেটজাত হচ্ছিল। বিহারের বেগুসরাই ছাড়া পাহাড়ের রিম্বিক, বিজনবাড়ি এবং সমতলের অধিকারি, বিধাননগর, নকশালবাড়ি থেকে দুধ আসছিল। কিন্তু নকশালবাড়ির দুধ ভাল নয় বলে দাবি করে এক সরকারি আধিকারিক কিছুদিন আগে নকশালবাড়ির দুধ সরবরাহ বন্ধ করে দেন। তাতে উৎপাদন আরও কমে গিয়েছে।
হিমূলের অফিসারদের একাংশ জানান, হিমূলের যন্ত্রপাতি পুরানো হয়ে গিয়েছে। পুরোটা কারখানাটির সংস্কার প্রয়োজন। তা দীর্ঘদিন হয়নি। কর্মীদের বকেয়ার পাহাড় জমেছে। এক দফায় সরকার সংস্থার পুনরুজ্জীবনের জন্য ১৫-২০ কোটি টাকা না দিলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে। বাম আমলে তো বটেই এই সরকারও অধিগ্রহণ ও নানা সমীক্ষা করালেও এখনও কিছুই হয়নি।