সান্টার গলা শুনেই ঝুমাকে চিনে ফেলল শিশুরা

গত কয়েক দিন ধরে ‘ঝুমা আন্টি’র কাছে সান্টা ক্লসের গল্প শুনছিল, ছোট্ট অর্ণব, অন্তরা, অঞ্জলি এবং দেবাশিস’রা। লাল টুপি, গিফটের প্যাকেট, চকলেট কেক দেয় সান্টা। তার স্লেজ রয়েছে।

Advertisement

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:২৮
Share:

পরশে বড়দিনের অনুষ্ঠান। নিজস্ব চিত্র।

গত কয়েক দিন ধরে ‘ঝুমা আন্টি’র কাছে সান্টা ক্লসের গল্প শুনছিল, ছোট্ট অর্ণব, অন্তরা, অঞ্জলি এবং দেবাশিস’রা। লাল টুপি, গিফটের প্যাকেট, চকলেট কেক দেয় সান্টা। তার স্লেজ রয়েছে। যা টানে মাথায় লম্বা শিংওয়ালা হরিণেরা। কতটা কী তারা বুঝছিল, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও খাবার সময় বা ওষুধ খাওয়ার সময় কচিকাঁচারা যে সে সবই মন দিয়ে শুনেছে, তা সকলেই বলছেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে ঝুমা আন্টিকে দেখতে না পেয়ে শিশুরা খোঁজাখুজিও করে। এরই মধ্যে হঠাৎ করে একগুচ্ছ খাকি পোশাক পরা পুলিশকাকু-আন্টিদের ভিড়ে পরিবেশটা একটু কেমন যেন হয়ে উঠে। কিছুক্ষণের মধ্যে চারদিকে ঝলমলে আলো, ফুল, কেক, স্টারে পরিবেশটা বদলে যায়। লাল পোশাক, টুপি পরে সান্টা ক্লসও এসে গিফট দেওয়া শুরু করতেই শিশুদের মুখে হাসির ঝিলিক।

Advertisement

পেনসিল বক্স, খেলনা, কেক, চকোলেট অকাতরে বিলাচ্ছিল সান্টা। এরই মধ্যে তার গলার স্বর শুনে শিশুরা এবং তাদের মা’রা বলে ওঠেন, ‘আরে এই তো ঝুমা’। পুরো নাম ঝুমা কাঞ্জিলাল। ফাঁসিদেওয়ার রাবভিটার বাসিন্দা। শিলিগুড়ি মহকুমার একমাত্র শিশুদের পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্র ‘পরশ’-এর সহায়িকা। ঝুমাই আন্টিই আজ সান্টা ক্লস। দার্জিলিং জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের সহায়তায় ফাঁসিদেওয়া হাসপাতাল লাগায়ো কেন্দ্রটিকে শিশুদের নিয়ে এই ভাবেই পালন হল বড়দিনের অনুষ্ঠান, ‘ক্রিসমাস ইভ’। আর যা শুনে ঝুমাও বললেন, ‘‘সারাদিন এই শিশুদের নিয়েই থাকি। ওদের জন্য নতুন কিছু করতে পেরে খুব ভাল লাগল।’’

প্রশাসনিক সূত্রের খবর, চলতি সপ্তাহেই দার্জিলিঙের জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব কেন্দ্রের শিশুদের জন্য একটা বড়দিনের অনুষ্ঠান করার জন্য স্থানীয় বিডিও বীরুপাক্ষ মিত্রকে নির্দেশ দেন। সেই মতো গত দু’দিন ধরেই অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা তৈরি হয়। ফাঁসিদেওয়া ব্লকের ইয়ুথ অফিসার দীপিকা সুব্বা বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে কাজও শুরু করেন। গিফট কেনা, কেন্দ্রটিকে সাজানো, কেকের অর্ডার, চকলেট আনানো সবই ঠিক হয়। তার মধ্যে ঠিক ছিল, শিশুদের অফিসার কাকু বা আন্টি’রা নয়, এ বার বড়দিনে সান্টা ক্লসই গিফট দেবে। তবে কে হবে সান্টা! বিডিও বা পুলিশ অফিসারদের কেউ তা হয়ে যাবেন বলে ঠিকও হয়ে যাচ্ছিল, তার মধ্যে ভাবা হয় ঝুমার কথা। কেন্দ্রের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ মৃত্তিকা সরকার কথা বলেন ঝুমার সঙ্গে। আর এক কথায় রাজিও হয়ে যান ঝুমা। সেই মতো ব্যবস্থা করা হয়, লাল পোশাক, টুপি আর সাদা দাড়ির।

Advertisement

বিডিও বীরুপাক্ষবাবুর কথায়, ‘‘এক মাস ধরে কেন্দ্রটিকে ওই শিশুরা মা’দের সঙ্গে পালা করে থাকে। পুষ্টিযুক্ত সুষম খাবার, ওষুধ সব দিয়ে ওদের ওজন ঠিক করা হয়। এর মধ্যে এসে গিয়েছে বড়দিন। তাই জেলাশাসকের ভাবনা থেকেই ছোট্ট অনুষ্ঠানটি। আমরা সাধ্য মতো শিশুদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’’ বিডিও জানান, এদিন সবচেয়ে বড় পাওনা ঝুমা’র সান্টা ক্লস। আমরা চেষ্টা করব, প্রতি উৎসবে কেন্দ্রটিতে এই ধরনের অনুষ্ঠান করার।

২০১৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে স্বাস্থ্য দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব ‘পরশ’-এর উদ্বোধন করেছিলেন। তার পর থেকে ব্লকের বিভিন্ন চা বাগান, গ্রামের কম ওজনের শিশুদের এক মাস করে রেখে সুষম খাবার, ওষুধপত্র দিয়ে ঠিকঠাক করা হয়। স্বাস্থ্য দফতরের থেকে চিকিৎসক, নার্স, বিশেষজ্ঞদের কেন্দ্রটিকে নিয়োগ করা রয়েছে। ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের কেন্দ্রটিকে রাখা হয়। ১০ শয্যার কেন্দ্রটিকে শিশুদের সঙ্গে থাকেন মায়েরাই। মায়েরা চা শ্রমিক বা দিনমজুর হওয়ায়, এক মাস ধরে তাদের প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি রাজ্যের মুখ্য সচিব সঞ্জয় মিত্র ও স্বরাষ্ট্র সচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রটি ঘুরে দেখে পরিকাঠামো বাড়ানোর জন্য প্রকল্প তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন।

এ দিন অনুষ্ঠানের পর ওই শিশুদের মা কৌশল্যা সোনার, লক্ষ্মী সৌরিয়া বা সর্বাণী কর্মকার, সুরফিনা রাউতিরা জানান, হঠাৎ করে এমন অনুষ্ঠান হবে, তা ভাবতে পারিনি। ব্লকের অফিসার, পুলিশ অফিসারদের নতুন ভাবে দেখলাম। ছেলেমেয়েদের খুব খুশি হয়েছে। ঝুমার কথা কেউ ভুলতেই পারছে না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement