সুরক্ষা ছাড়া বাগানে কীটনাশক ছড়াতে হচ্ছে রবি, কিরণদের

ওষুধ ছিটিয়ে চা পাতাকে সবুজ রাখতে হয় ওদের। আর দিনের পর দিন এই কাজ করতে গিয়েই গভীর অসুখে আক্রান্ত হওয়ার পথে রবি ওঁরাও, কিরণ মারান্ডিরা। মুখে বাঁধার ‘মাস্ক’ নেই, হাতের জন্য ‘গ্লাভস’ও পান না। দিনের পর দিন বিনা মুখোশ আর দস্তানায় বিষাক্ত কীটনাশক ছড়িয়ে রবি-কিরণ-দের অনেকেই চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। প্রতিনিয়ত কীটনাশকের ঝাঁজ চোখে মুখে ঢুকছে।

Advertisement

সব্যসাচী ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০১৫ ০২:৫৯
Share:

ওষুধ ছিটিয়ে চা পাতাকে সবুজ রাখতে হয় ওদের। আর দিনের পর দিন এই কাজ করতে গিয়েই গভীর অসুখে আক্রান্ত হওয়ার পথে রবি ওঁরাও, কিরণ মারান্ডিরা। মুখে বাঁধার ‘মাস্ক’ নেই, হাতের জন্য ‘গ্লাভস’ও পান না। দিনের পর দিন বিনা মুখোশ আর দস্তানায় বিষাক্ত কীটনাশক ছড়িয়ে রবি-কিরণ-দের অনেকেই চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। প্রতিনিয়ত কীটনাশকের ঝাঁজ চোখে মুখে ঢুকছে। এরফলে শরীরেও সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকছে। কিন্তু চা বাগান কর্তৃপক্ষগুলির এ ব্যাপারে কোনও হুঁশ নেই বলেই অভিযোগ।

Advertisement

যদিও বাগিচা শ্রম আইনে কীটনাশক ছড়ানোর কাজ করা শ্রমিকদের মুখোশ, হাতমোজা, জুতো দেবার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু সেই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই চলে যাচ্ছে বছরের পর বছর। শ্রমিকদের প্রতি এ ধরনের মনোভাবে ক্ষুদ্ধ শ্রমিক সংগঠনগুলিও।

বাগিচা ফসল হিসাবে চা পাতায় রোগপোকার আক্রমণ সর্বাধিক। পাতার রস শুষে ফেলা কিংবা চা গাছের সবুজ পাতা খেয়ে ফেলা লুপার, হেলাপাইটিসের মতো পোকার প্রাদুর্ভাব চা বাগানে খুবই বেশি। সমস্যার মোকাবিলাতে তাই জোরালো কীটনাশক ছেটানোই চা বাগানের রেওয়াজ। সে জন্যে প্রতিটি চা বাগানেই আলাদা শাখা রয়েছে। বাগানের আধিকারিকরা কী ধরনের কীটনাশক কী পরিমানে জলে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে তা বলে দেওয়ার পর শ্রমিকরা নিজেরাই কীটনাশকের দ্রবণ তৈরি করে ছিঁটিয়ে দেন। চড়া উগ্র গন্ধ সত্ত্বেও নাক মুখ খোলা অবস্থাতেই সে কাজ করেন শ্রমিকরা। দশকের পর দশক ধরে ডুয়ার্সে এই ছবির বদল হয়নি বলেই অভিযোগ শ্রমিক সংগঠনগুলির।

Advertisement

চা গাছের পোকা মারতে যে ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় সেগুলি সবই ‘অর্গানো ফসফরাস’ শ্রেণির। চিকিৎসকদের মতে, মানুষের শরীরে এর প্রভাব খুবই মারাত্মক। ডুয়ার্সের চা বাগান অধ্যুষিত নাগরাকাটার ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক শুভজিৎ হাওলাদারের কথায়, ‘‘অর্গানো ফসফরাস নাক বা মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করলেই যে শুধু ক্ষতি করবে এমনটা নয়, সেই সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শেও নানা রোগ ঘটাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী ভাবে এর প্রভাব মারাত্মক ক্ষতি করলেও আলাদা ভাবে কীটনাশকের জন্যে কী কী রোগ হচ্ছে তা নির্ণয় করা সহজ নয়।’’

কীটনাশক ছেটানো শ্রমিকেরা অসুস্থতাকে আমন্ত্রণ করছে বলে দাবি আদিবাসী বিকাশ পরিষদের রাজ্য সহ সভাপতি তেজকুমার টোপ্পোর। তাঁর কথায়, ‘‘শ্রমিকরা সচেতন নয় বলেই বুঝতে পারছে না। আমরা বাগান কর্তৃপক্ষদের নানা ভাবে এই বিষয়ে সতর্ক করেছি কিন্তু ওরা নির্বিকারই থেকেছে। কীটনাশক ছেটাবার পর হাত ধোয়ার জন্যে সাবানও বাগান কর্তৃপক্ষ দেয় না।’’ বিধি অনুযায়ী, এই শ্রমিকদের সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান করা এবং তিন মাস অন্তর অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর দাবি জানানো হবে বলে পরিষদ জানিয়েছেন। ২৩টি চা শ্রমিক সংগঠনের যৌথমঞ্চের অন্যতম আহ্বায়ক জিয়াউল আলমের অভিযোগ, ‘‘রাজ্য সরকার আদৌ এই বিষয়ে সচেতন নয়। সে কারণেই চা বাগান কর্তৃপক্ষ শ্রমিক স্বার্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারছে। কীটনাশকের প্রয়োগের সময় শ্রমিকদের কী সুরক্ষা দেওয়া উচিত তা তদারকিতে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ।’’

Advertisement

তবে মালিকদের সংগঠনগুলি এই অভিযোগ মানতে রাজি নয়। চা বাগান মালিকদের সংগঠন ইন্ডিয়ান টি প্লানটেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের উপদেষ্টা অমিতাংশু চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘বাগানগুলি শ্রমিকদের সুরক্ষা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। সব ক্ষেত্রেই চা শ্রমিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়। কোথাও ব্যতিক্রম হয়েছে বলে মনে হয় না।’’ চা মালিকদের আরেকটি সংগঠন ডিবিআইটিএ-এর কর্মকর্তা তথা একটি চা বাগানের ম্যানেজার তাপস দাস বলেন, ‘‘সিংহভাগ বাগানেই কীটনাশক ছেটানো চা শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। যে‌খানে নেই, সেখানে দ্রুত নিতে হবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement