শিলিগুড়িতে বিক্রি হচ্ছে বিরিয়ানি। ছবি: সন্দীপ পাল।
কোথাও ‘জাম্বো’ তো কোথাও আবার ‘মিনি’। আবার হায়দারবাদী, লখনউ, চেন্নাই কী নেই! কোথাও দম, কোথাও হান্ডিও। নতুন যোগ হয়েছে, আওয়াধি ঘরানাও। সেখানে মটন, চিকেনের সঙ্গে রয়েছে পালং শাক থেকে চিংড়িও। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁ থেকে পাড়ার মোড় এই রকমফেরের মধ্যেই শিলিগুড়ির পুজোয় বাঙালির রসনায় হাতছানি দিচ্ছে ‘বিরিয়ানি’। ৬০ টাকা থেকে ৩৬০ টাকা, কড়ি ফেললেই পুজোর দিনগুলিতে দুপুর থেকে ভোর অবধি মিলবে নানা স্বাদের বিরিয়ানি।
মোমো, চাউমিন বা রোলের শহর বলে পরিচিত শিলিগুড়িতে পুজোয় ভোজন রসিকদের পাতে ভরাতে চলছে বিরিয়ানি। তাই পুজোর তিন দিন আগেও ভোলবদল দেখা যাচ্ছে অনেক দোকানের। কেক, পেস্ট্রির দোকান রাতারাতি রং করে বদল বিরিয়ানি হাউস হয়ে উঠছে। আবার কোথাও স্টেশনারি দোকানের সামনে বড় হাঁড়ি বা সাইনবোর্ড বসেছে বিরিয়ানির। প্রতিযোগিতায় ছিটকে পড়ার ভয়ে অনেক সাবেকি পাইস হোটেল বা ভাতের হোটেলের মালিকেরাও বিরিয়ানির ব্যবস্থা করছেন পুজোয়। প্রচারের জন্য কয়েক জায়গায় তা শুরুও হয়ে গিয়েছে পুরোদমে।
শহরের পুরানো বাসিন্দা তথা লেখক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘বিরিয়ানি নিয়ে এমন মাতামাতি সারা দেশে শিলিগুড়িতেই দেখছি। আর এখানে দুপুর থেকে অলিগলিতে বিরিয়ানির গন্ধে ছেয়ে যাচ্ছে। পুজো আসতেই তা বেড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ভালই লাগে। গন্ধে অর্ধেক ভোজন হয়ে যায়। তবে নাম আর সংখ্যা যা দেখছি, তাতে শিলিগুড়িতে বিরিয়ানি নিয়ে গবেষণাও হতে পারে।’’
পারসি শব্দ ‘বেরিয়া’ থেকে বিরিয়ানি’র উৎপত্তি। যার মানে ভাজা বা সেঁকা। মোগলদের হাত ধরে রান্নাঘরে পৌঁছেছে হায়দারবাদি বা লখনউ বিরিয়ানি। আবার কখনও যোগ হয়েছে মুম্বই বা করাচির বিরিয়ানিও। ভাত, মাংস এবং মশলার সঙ্গে বিশেষ প্রক্রিয়া দিয়ে তৈরি হয় বিরিয়ানি। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে প্রাচীন এই রেসিপিতে। যেমন শিলিগুড়ির হিলকার্ট রোডের সেবক মোড় লাগোয়া একটি রেস্তোরাঁ পুজোয় আওধি ঘরানার বিরিয়ানির ব্যবস্থা হযেয়াছে। রান বিরিয়ানি, হান্ডি বিরিয়ানি, মুর্গ বিরিয়ানি, ভেজ বিরিয়ানির সঙ্গে যোগ হয়েছে ঝিঙ্গা (চিংড়ি) বিরিয়ানি বা পালক বা পালং শাকের বিরিয়ানিও।
রেস্তোরাঁটির নীচেই রয়েছে শহরের আরেকটি পুরানো রেস্তোরাঁ। সংস্থার আধিকারিক অনুপম ভট্টাচার্য জানান, ‘‘আমরা পুনে এবং গোয়া থেকে শেফদের এনেছি। তাঁরা বিশেষ হায়দরাবাদি বিরিয়ানি এবং মটন বিরিয়ানি তৈরি করছেন। মটন এবং চিকেন দিয়ে এক সঙ্গে পুজো স্পেশাল বিরিয়ানিও থাকছে। সঙ্গে মটন হায়দরবাদি বা চিকেন বনজারা বা ভেটকির ফিস কোলবা’র মতো জিভে জল আসা পদ তো রয়েছেই।
বিধানরোডের একটি প্রসিদ্ধ হোটেলে-রেস্তোরাঁয় প্রতিবারই পুজো স্পেশাল মেনু করা হয়। সংস্থার কর্ণধার বাবলা ঘোষ বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা পুজোয় স্পেশাল রেসিপি করি। বাসিন্দাদের চাহিদাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবার মটন-চিকেন বিরিয়ানিও করছি।’’
এতো গেল শীতাতপ রেস্তোরাঁ বা শহরের কিছু নামকরা হোটেলের ছবি। বিরিয়ানির এই লড়াইয়ের ময়দানে পুরো দস্তুর টিকে থাকতে শহরের বিরিয়ানি হাউস বলে পরিচিত পুরানো দোকানগুলিও নানা ভাবে চমক দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বর্ধমান রোডের ধারে ওভারব্রিজ লাগোয়া একটি বিরিয়ানির দোকানের অন্যতম মালিক আজিজুর রহমানের দাবি, ‘‘বিরিয়ানির সঙ্গে এই শহরের পরিচিতি আমরাই করিয়েছি। আমাদের দম বিরিয়ানি লোকের মুখে মুখে ঘোরে। সঙ্গে রেশমি-টিক্কা-টেংরি-কড়াই কাবাব-সহ একাধিক আইটেম তো আছেই। ওয়েবসাইট তৈরি করেছি, ফোনে অর্ডার নেওয়া থেকে শুরু করে পুজোর দিন ভোর ৪টে পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা হবে।’’
একই ভাবে হাসমিচক উড়ালপুল লাগোয়া বিরিয়ানির দোকানের মালিক নজরুল ইসলাম জানান, ‘‘মটন ছাড়াও দেশি চিকেন, পোলট্রির আলাদা বিরিয়ানি থাকছে। ফেসবুক পেজ করেছি। বন্ধুবান্ধব, পরিচিতরা ছাড়াও অনেকেই খোঁজ নিচ্ছে। ভোর ৬টা অবধি আমাদের বিরিয়ানি শহরে থাকবে।’’
নজরুল বা আজিজুরদের মতোই বিধানরোডের পুরানো ডুয়ার্স বাসস্ট্যান্ডের পুরানো আরেকটি বিরিয়ানি দোকানের মালিক পল্লব চক্রবর্তী জানান, চিকেন-মটেন বিরিয়ানির সঙ্গে পুজোয় বড় মাংসের টুকরো দেওয়া ‘জাম্বো বিরিয়ানি’ বা কচিকাঁচাদের কথা ভেবে ‘মিনি বিরিয়ানি’ থাকছে।
হাকিমপাড়া থেকে সুভাষপল্লি, এনজেপি থেকে থানামোড়, প্রধাননগর থেকে বিহারমোড়—এমনই অলগলিতে শহরে শতাধিক বিরিয়ানির দোকান গজিয়ে উঠেছে। এক চিলতে ঘরের সামনে বা রাস্তা পাস্টিক চেয়ার পেতে দেদার চলছে বিরিয়ানি ভোজন। অধিকাংশ দোকানিদের কথায়, ‘‘সবার পক্ষে বড় হোটেল বা রেস্তোরাঁয় যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ইচ্ছা তো সবারই রয়েছে। তা মেটাতেই অলিগলিতে আজ সস্তার বিরিয়ানি এসেছে।’’