কর্তা নিদ্রা গিয়েছেন, ট্রেন নড়ানোই বারণ

ভগবানেরও ঘুম পায়। এবং কখন তিনি নিদ্রা যাবেন, কেউ জানে না। তবে এটুকু জানা আছে, ভগবান নিদ্রা গেলে গোলমাল বিলকুল নিষেধ। কারণ, তিনি গোলযোগ সইতে পারেন না।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

কলকাতা শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০১৬ ০২:৪৮
Share:

স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম জুড়ে দাঁড়িয়ে পদাতিক এক্সপ্রেস। —নিজস্ব চিত্র।

ভগবানেরও ঘুম পায়। এবং কখন তিনি নিদ্রা যাবেন, কেউ জানে না। তবে এটুকু জানা আছে, ভগবান নিদ্রা গেলে গোলমাল বিলকুল নিষেধ। কারণ, তিনি গোলযোগ সইতে পারেন না।

Advertisement

মুশকিল হল, রেলের মতো সংস্থায় ভগবান অনেক। তাঁদের কে কখন নিদ্রা যাবেন, খেয়াল রাখতে হয় রেলকর্মীদের। এবং সেই কর্তব্যবোধ থেকেই তাঁরা বিলক্ষণ জানেন, কোনও রেল-ভগবান ট্রেনেই নিদ্রা গেলে ট্রেনের চাকা নড়ানো বারণ। কেননা ভগবান গোলযোগ সইতে পারেন না। ঘুমের মধ্যে তো নয়ই।

ব্যস, চাক্কা অনড় থাকল পদাতিক এক্সপ্রেসের। কারণ, ওই ট্রেনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া সেলুনকারে নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন এক রেলকর্তা। তাই তিন ঘণ্টা ধরে শিয়ালদহের মতো ব্যস্ত স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকল আস্ত ট্রেনটি। আর প্ল্যাটফর্ম খালি না-থাকায় শুক্রবার সকালের ব্যস্ত সময়ে শিয়ালদহ স্টেশনে বেশ কয়েকটি দূরপাল্লা এবং লোকাল ট্রেনের সময়মতো পৌঁছতে বা ছাড়তে দেরি হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement

রেল সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার মালদহ থেকে ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার বা ডিআরএম-এর সেলুনকারটি জোড়া হয়েছিল শিয়ালদহমুখী পদাতিক এক্সপ্রেসে। শুক্রবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে ট্রেনটি শিয়ালদহে পৌঁছয়। কিন্তু যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পরেও ট্রেনটিকে কারশেডে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা করে দেওয়া যায়নি।

কারণ? রেলের ওই বড়সড় কর্তা নিজের সেলুন থেকে নামেননি। কারণ? ওই রেলকর্তার ঘুম ভাঙেনি।

অগত্যা ওই প্ল্যাটফর্মেই দীর্ঘ ক্ষণ আটকে থাকে খালি ট্রেনটি। থুড়ি! কর্তাকে নিয়ে আংশিক ভর্তি ট্রেনটি!!

এমনিতেই শিয়ালদহে ট্রেনের তুলনায় প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা কম। তার মধ্যে আবার ১২ কামরার লোকাল ট্রেন দাঁড়ানোর প্ল্যাটফর্ম আরও কম। এই অবস্থায় ব্যস্ত সময়ে ঘুমন্ত রেলকর্তাকে নিয়ে পদাতিক এক্সপ্রেস ওই ধরনের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকায় হইচই শুরু হয়ে যায়।

রেলকর্মীরা জানান, দূরের ট্রেনের যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পরে সেটিকে কারশেডে পাঠিয়ে দেওয়াটাই দস্তুর। তাতে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মটি অন্যান্য ট্রেনের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে। আবার কারশেডে দেখভাল, সাফসুতরো করার পরে দূরপাল্লার ট্রেনটিকে পরবর্তী সফরের জন্য তৈরি করে দেওয়া যায়। কিন্তু এ দিন পদাতিক এক্সপ্রেসকে প্ল্যাটফর্ম থেকে কারশেডে পাঠানো যায়নি। পাছে অকালে ঘুম ভাঙালে ডিআরএম কুপিত হন! ট্রেন না-সরিয়ে কর্তার কামরায় বাইরে থেকে বিদ্যুৎ চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হয় কর্মীদের।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে, ১০টা ৪০ নাগাদ ডিআরএম সেলুনকার থেকে নামেন। ট্রেনটিকে কারশেডে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ট্রেনটিকে বার করতে করতে ১১টা বেজে যায়। তত ক্ষণ ওই প্ল্যাটফর্মে কোনও ট্রেন ঢুকতে বা বেরোতে পারেনি কোনও ট্রেন। দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে বিপাকে পড়েন শিয়ালদহ ডিভিশনের কর্তারা। রেলকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, ওই রেলকর্তাকে বাঁচানোর জন্য শিয়ালদহ কন্ট্রোলে বেশ কিছু নথি লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার জেরে বেশ কয়েকটি ট্রেন যে স্টেশনের বাইরে আটকে গিয়েছিল, তার কোনও রেকর্ডই রাখা হয়নি। এক কর্তা অবশ্য বলেছেন, শিয়ালদহ কন্ট্রোল ট্রেনের দেরির বিষয়টি রেকর্ডে না-রাখলেও কাঁকুড়গাছি ও দমদম রুট রিলে ইন্টারলক কেবিনের রেকর্ড দেখলে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে। কর্মীদের প্রশ্ন, সেখানেও যদি সব নথি নষ্ট করে ফেলা হয়, তখন কী হবে?

জবাব নেই।

এমন পরিস্থিতি হলই বা কেন?

রেলকর্মীদের একাংশের বক্তব্য, ঘুমন্ত রেলকর্তা-সহ সেলুনটিকে কারশেডে নিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা যেত অনায়াসেই। তা হলে প্ল্যাটফর্ম আটকে রাখার অভিযোগ উঠত না। কিন্তু কেন সেটা করা হয়নি, সেই প্রশ্ন জোরদার হয়েছে। মালদহের ডিআরএম সম্পর্কে যাবতীয় অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন রেলকর্তারা। তাঁরা বলছেন, কারশেডে ট্রেন পাঠাতে দেরি হয়েছে ঠিকই। তবে গোলমাল বাধে ওই সময় শান্টিং ইঞ্জিন না-থাকায়। পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক বলেন, ‘‘তখন কোনও শান্টিং ইঞ্জিন পাওয়া যায়নি। তাই দেরি হয়েছে।’’ রেলকর্তাদের এই বক্তব্য ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে শিয়ালদহের রেলকর্মীদের। তাঁদের বক্তব্য, শান্টিং মেশিনের অভাবের যে-যুক্তি কর্তারা দেখাচ্ছেন, সেটা মেনে নেওয়া যায় না। রেলের এমন অবস্থা হয়নি যে, শিয়ালদহের মতো প্রথম সারির স্টেশনে শান্টিং ইঞ্জিনের ঘাটতি মেটাতে পারছে না। ‘‘আসলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন কর্তারা,’’ বলেন কিছু রেলকর্মী।

এই ব্যাপারে মালদহের ডিআরএম রাজেশ অর্গলের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ফোনে তাঁকে ধরা যায়নি। রাত পর্যন্ত তাঁর ফোন বন্ধ ছিল। এসএমএস করা হলেও তার জবাবও আসেনি।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন