এত কালের আতঙ্কের যাত্রাপথে এ বার ইতি হয়ে গতি আসতে চলেছে যশোর রোডে।
বনগাঁ, বসিরহাট কিংবা বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে বারাসত হয়ে কলকাতা ঢুকতে গেলে সবচেয়ে আতঙ্কের রাস্তাপথ ছিল বারাসতের ডাকবাংলো মোড় এবং মধ্যমগ্রাম চৌমাথা। বাস্তবিকই চর্তুদিক থেকে আসা যানবাহন আর স্থানীয়দের হাঁটাচলায় ওই দুই জায়গায় গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো দীর্ঘক্ষণ। ট্রাফিক পুলিশের কর্মী বাড়িয়েও সে ব্যাপারে সুরাহা করতে পারেনি উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন মায় পুলিশ। এ বার ডাকবাংলো মোড়ে দীর্ঘ এক উড়ালপুল এবং মধ্যমগ্রামে একটি আন্ডারপাস তৈরির প্রস্তাব নিয়েছে রাজ্য সরকার। এই দু’টি কাজ শেষ হয়ে গেলে যাতায়াত সমস্যা অনেকটাই মিটে যাবে বলে মনে করছেন এলাকার মানুষ।
বুধবার এই বিষয়টি নিয়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সড়ক, পরিবহণ ও জাহাজ মন্ত্রকের সঙ্গে বৈঠক করেন এই রাজ্যের পূর্ত দফতরের কর্তারা। সেখানে এয়ারপোর্ট থেকে বারাসত পর্যন্ত ৩৫ নম্বর জাতীয় সড়ক (যশোর রোড) সম্প্রসারণের কাজ এবং বারাসতের ডাকবাংলো মোড়ের উড়ালপুল, মধ্যমগ্রামের আন্ডারপাস নিয়েও আলোচনা হয়।
বর্তমানে বারাসত থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যশোর রোড দেখভাল করে রাজ্য সরকারের পূর্ত দফতরের অধীনস্থ জাতীয় সড়ক বিভাগ। বুধবার বৈঠকের শেষে দিল্লি থেকে ওই বিভাগের সুপারেন্টেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার রাজীব চট্টরাজ বলেন, ‘‘এ দিনের বৈঠকে এয়ারপোর্ট থেকে বারাসত পর্যন্ত যশোর রোড সম্প্রসারণের কাজে অগ্রগতি, সমস্যা এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন প্রস্তাবও নেওয়া হয়েছে।’’
কী সেই প্রস্তাব?
এক, এয়ারপোর্ট থেকে বারাসত ডাকবাংলো মোড় পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাটি ‘ওয়ান ওয়ে’ এবং চার লেন তৈরির কাজ চলছে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সড়ক মন্ত্রক ইতিমধ্যেই ৮০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে। রাস্তার নীচ দিয়ে ‘হাই ড্রেনে’ এর মাধ্যমে নিকাশির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঠিক হয়েছে, এর মাঝখান দিয়ে ডিভাইডার ছাড়াও যেখানে যেখানে সম্ভব (দোলতলা, মধ্যমগ্রাম চৌমাথার মতো সরু এলাকা বাদ দিয়ে) সার্ভিস লেন করা হবে। আগামী মে মানের মধ্যেই এই কাজ শেষ করার চেষ্টা করা করা হবে।
দুই, মধ্যমগ্রাম চৌমাথায় স্টেশনের দিক থেকে একটি আন্ডারপাস তৈরি হবে। এই পথে কেবলমাত্র পথচারীরাই যাতায়াত করতে পারবেন। এর ফলে চারদিক থেকে আসা যান চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হবে। ওই আন্ডারপাসটি তৈরির জন্য ২ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছেন বারাসতের সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদার। এ দিন দিল্লিতে বৈঠকের পরে রাজীববাবু বলেন, ‘‘সাংসদ কোটার ওই ২ কোটি টাকার বাইরে বাকি টাকা দেবে রাজ্য সরকার।’’
এ দিন কাকলীদেবী বলেন, ‘‘মধ্যমগ্রামের ওই চৌমাথা একদিক দিয়ে যেমন জাতীয় সড়ক ধরে যান চলাচলে জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই স্থানীয় মানুষদের পুরসভা, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজে যাতায়াতেরও একমাত্র পথ। সে জন্য আন্ডারপাসটি তৈরি হয়ে গেলে দু’পক্ষের সমস্যাটা মিটে যাবে। সে জন্যই এ ব্যাপারে আমরা উদ্যোগী হয়েছি।’’
তিন, বারাসতের ১১ নম্বর রেলগেটের যানজট এড়াতে সেখানেও একটি উড়ালপুলের প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে এ দিনের বৈঠকে। কিন্তু ওই উড়ালপুলটি তৈরি হলে ডাকবাংলো মোড় এর যানজট যে কমবে না সেই প্রশ্নও ওঠে। সেই চিন্তা করেই উড়ালপুলটি টেনে নামানো হবে যশোর রোডে। তাহলে কৃষ্ণনগর রোড (৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক) এবং বারাসত থেকে এয়ারপোর্টগামী যশোর রোডের (৩৫ নম্বর) যানজটের সমস্যা অনেকটাই মিটে যাবে বলে জানান রাজীববাবু।
এই কাজগুলো দ্রুত যাতে শেষ হয় সে ব্যাপারে উদ্যোগী হচ্ছে জেলা প্রশাসনও। এ দিনের বৈঠকের কথা জানার পরে জেলাশাসক মনমীন কৌর নন্দা বলেন, ‘‘যাতায়াতের সুবিধার জন্যই এমন সব পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আমারাদের চেষ্টা একটাই, যত দ্রুত কাজগুলি শেষ করা যায়।’’
সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনই গাড়ি নিয়ে কলকাতায় কাজে আসেন ঠাকুরনগরের বাসিন্দা আশিস বিশ্বাস। তাঁর কথায়, ‘‘প্রতিদিন যারা গাড়ি নিয়ে এই পথে আসেন, শুধু তারাই জানেন ঘণ্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে এই নরক যন্ত্রণার কথা। এই কাজগুলো হলে সে যন্ত্রণা যে অনেকটাই কমে যাবে তা বলাইবাহুল্য।’’
আরও সুবিধা হবে জানিয়েছে রাজ্য পূর্ত দফতর। এ দিন বৈঠকের পরে তারা জানিয়েছেন বনগাঁ থেকে বারাসত পর্যন্ত বনগাঁ, হাবরা (২ টি), অশোকনগর এবং বারাসতের কাজিপাড়ার রেলপথের উপরে ৫টি উড়ালপুলও তৈরি হবে। ফলে যন্ত্রণা কমবে অনেকটাই।
সেই আশাতেই রয়েছেন আশিসবাবুর মতোই এলাকার মানুষ।