ভোট-বাজারে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতিত্ব’-এর অভিযোগ তুলেছিল বিরোধী দলগুলি। তার জেরে ভোটপ্রক্রিয়া চলাকালীনই দফায় দফায় ৬৭ জন অফিসারকে বদলি করে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একাধিক আমলা এবং পুলিশ কর্তা। নবান্নে দ্বিতীয় দফায় পা রাখার আগেই সকলকে পুরনো পদে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, আগে ওই অফিসাররা পুরনো পদে ফিরে যাবেন। তার পর শপথ নেবেন তিনি। আগামী শুক্রবার, ২৭ তারিখ রেড রোডে শপথ নেওয়ার কথা মমতার। তার আগেই বদলে যাবেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার।
কলকাতায় প্রথম দফা ভোটের দিন দশেক আগে, ১২ এপ্রিল রাজীব কুমারকে সরিয়ে সৌমেন মিত্রকে পুলিশ কমিশনার করার নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। শিরদাঁড়া সোজা রেখে ভোট করিয়ে আমজনতার প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন নয়া কমিশনার। তবে মমতা ফের ক্ষমতায় ফেরার পরেই তাঁকে বিদায় নিতে হচ্ছে। নবান্ন সূত্রের খবর মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে আজ, শনিবারই সৌমেন মিত্রকে সরিয়ে ফের রাজীব কুমারকে ফিরিয়ে আনার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। আগামী সপ্তাহের গোড়াতেই রাজীব কুমার দায়িত্ব নিতে পারেন। সৌমেন মিত্রকে কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদই দেওয়া হবে বলে খবর।
কমিশন যে সব জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, অফিসারকে সরিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে দু’এক জন পুরনো পদে ফিরতে আগ্রহী নন। বাকিদের ফেরানোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে নবান্ন। শপথগ্রহণের আগে বদলি হওয়া ৬৭ জনকেই হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু সরকারি আদেশনামা যাতে বের হয়ে যায় সেই ব্যবস্থা হচ্ছে।
কমিশনের নির্দেশে ভোটের আগে পশ্চিম মেদিনীপুরে মাওবাদী দমনের অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি পদ থেকে সিআইডিতে সরানো হয়েছিল ভারতী ঘোষকে। তাঁকে ফের জেলায় পাঠানো হতে পারে। এ ছাড়া, সরানো হয়েছিল দক্ষিণ দিনাজপুরের এসপি অর্ণব ঘোষ, মালদহের এসপি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরভূমের এসপি মুকেশ কুমার, বর্ধমানের এসপি কুণাল অগ্রবাল, উত্তর ২৪ পরগনার এসপি তন্ময় রায়চৌধুরীকে। তাঁদের পুরনো পদে ফেরা সময়ের অপেক্ষা।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক পদে পারভেজ বি সেলিম ফিরতে চলেছেন। তবে সঞ্জয় বনসল হুগলির জেলাশাসক পদে ফিরতে আগ্রহী নন বলেই খবর। পুরনো পদে বহাল হতে চলেছেন কয়েক জন মহকুমা পুলিশ অফিসার এবং ৫০টিরও বেশি থানার আইসি-ওসি-রা। এমনকী, কলকাতা উত্তর এবং দক্ষিণের যে দুই নির্বাচনী আধিকারিককে সরিয়েছিল কমিশন, তাঁরাও ফিরছেন স্বপদে।
প্রশাসন সূত্রের খবর, কমিশনের নির্দেশ মেনে চলতে গিয়ে বেশ কয়েক জন পুলিশ অফিসার শাসক দলের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধমূলক’ আচরণ করেছেন বলে তৃণমূলের অভিমত। দলীয় স্তরেই মমতার কাছে বেশ কয়েক জন আইপিএস অফিসারের নামে অভিযোগ জমা পড়েছে। এঁরা হলেন, বর্ধমানের এসপি গৌরব শর্মা, দক্ষিণ দিনাজপুরের এসপি রশিদ মুনির খান, উত্তর ২৪ পরগনার আনাপ্পা ই, কলকাতা পুলিশ কমিশনার সৌমেন মিত্র, বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার জাভেদ শামিম, ডিসি (ডিডি-টু) নগেন্দ্র ত্রিপাঠী প্রমুখ।
শাসক দল মনে করছে, যে সব জেলায় পুলিশ সুপারদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেখানে ভোটে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। যেমন, দক্ষিণ দিনাজপুরে তৃণমূল মাত্র ২টি আসন জিতেছে। হেরে গিয়েছেন পূর্তমন্ত্রী শঙ্কর চক্রবর্তী। আবার মালদহে দলের খাতা খোলেনি। সেখানে হেরেছেন দুই মন্ত্রী সাবিত্রী মিত্র এবং কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী। ওই দুই জেলার এসপি-র বিরুদ্ধে এখনই কোনও ব্যবস্থা না নিলেও শাসক দলের খাতায় তাঁরা ‘কালো তালিকাভুক্ত’ হয়ে গিয়েছেন বলেই প্রশাসনিক মহলের খবর।
এক প্রশাসনিক কর্তা শুক্রবার বলেন, ‘‘নতুন সরকার গঠনের তিন-চার মাস পরে ডিএম-এসপি স্তরে বড়সড় রদবদলের পরিকল্পনা আছে।’’ যে সব জেলায় তৃণমূলের ভাল ফল হয়নি, সেখানকার প্রশাসনিক কর্তাদের মাস কয়েকের মধ্যেই রদবদল করা হতে পারে। ‘‘মুখ্যমন্ত্রী এখন থেকেই ২০১৮-এর পঞ্চায়েত ভোটের প্রস্তুতি শুরু করে দিতে চান। সে দিকে তাকিয়েই এমন সিদ্ধান্ত’’— বলেন নবান্নের এক শীর্ষ কর্তা।