(বাঁ দিকে) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লেখা খোলা চিঠিতে দলের স্লোগানবদলের দ্যোতনা। তিনি ভুয়ো ভোটার, অনুপ্রবেশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে নিশানা করলেও নজর কেড়েছে ‘জয় মা কালী’ সম্বোধন। যে বিজেপি ‘জয় শ্রীরাম’-এ অভ্যস্ত তাদের শীর্ষনেতার কালী-শরণ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মত অনেকের। বাঙালি অস্মিতা ছুঁতেই এই বদল বলে মনে করছেন তাঁরা।
লোকসভা ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে তাঁর করা শেষ বক্তৃতায় ‘জয় শ্রীরাম’ আর ‘জয় মা কালী’-ধ্বনিতে ফারাক নেই বলে সরব হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। গত বছর জুলাই মাসে দুর্গাপুরের সভায় মোদীর মুখে ‘জয় মা কালী’, ‘জয় মা দুর্গা’ ধ্বনি শোনা গেলেও এক বারের জন্যও ‘জয় শ্রীরাম’ উচ্চারণ করেননি। তখন তা নিয়ে কটাক্ষ করে তৃণমূল বলেছিল, বাংলায় পরিবর্তনের ডাক দিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীরই পরিবর্তন হয়ে গেল। গত মাসে বঙ্গ সফরে এসে অমিত শাহ পুজো দিয়েছিলেন কলকাতার ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে। বিজেপি শীর্ষনেতৃত্বের এই কালী-শরণ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
বঙ্গবাসীর উদ্দেশে লেখা চিঠিতে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য সরকারকে খোঁচা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ধর্মীয় শরণার্থীদেরও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে বার্তা দিয়ে রাখলেন খোলা চিঠিতে।
ফেব্রুয়ারির শুরুর দিক থেকে রাজ্যে ‘গৃহ সম্পর্ক অভিযান’ শুরু করেছে বিজেপি। সাধারণ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারাভিযান চলছে। বিজেপি সূত্রে খবর, ওই কর্মসূচির মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রীর লেখা খোলা চিঠি তুলে দেওয়া হচ্ছে রাজ্যের সাধারণ ভোটারদের হাতে। চিঠিটির শুরুই হয়েছে, ‘আমার প্রিয় পশ্চিমবঙ্গবাসী’ দিয়ে। তার পরেই ‘জয় মা কালী’ লিখে চিঠির মূল বয়ান শুরু করেছেন মোদী। পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে বিজেপির ‘ভোট ভিক্ষা’র একটি অঙ্গ এই চিঠি।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কথা চিঠিতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি লিখেছেন, “আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোন পথে চালিত হবে, তা নির্ভর করছে আপনার একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের উপর। সেই গুরুদায়িত্ব আপনাদের।” কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কথাও সেখানে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর থেকে একটি দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গই ছিল দেশের অর্থনীতি এবং শিল্পে অগ্রণী ভূমিকায়। কিন্তু এখন ‘অপশাসন’ এবং ‘তোষণমূলক’ রাজনীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে লিখেছেন তিনি।
চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, কর্মসংস্থানের অভাবে যুবসমাজ ভিন্রাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্থায়ী চাকরির অভাব নিয়ে বিজেপি অতীতে বার বার সরব হয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যে ভারী শিল্পের অভাব নিয়েও। রাজ্যবাসীকে লেখা খোলা চিঠিতেও সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের নারী নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। মোদী লিখেছেন, “নিরাপত্তার অভাবে আমার পশ্চিমবঙ্গের মা-বোনেরা আজ শঙ্কিত এবং ত্রস্ত।” পশ্চিমবঙ্গের মহিলারা কেন নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন, তা নিয়ে অবশ্য বিস্তারিত বর্ণনা দেননি তিনি। তবে অনেকে মনে করছেন, ২০২৪ সালে আরজি কর হাসপাতালের মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার কথাই ফের স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন মোদী।
একই সঙ্গে নাম না করে মতুয়া সম্প্রদায়ের উদ্দেশেও বার্তা দিয়ে রেখেছেন তিনি। খোলা চিঠিতে মোদী লিখেছেন, বিজেপি রাজ্যবাসীর সেবা করার সুযোগ পেলে ধর্মীয় শরণার্থীরা সিএএ-র মাধ্যমে এ দেশের নাগরিকত্ব পাবেন। অনেকে মনে করছেন, এই বার্তার মাধ্যমে আসলে মতুয়াদের কাছেই নিজের বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি বাঙালি মনীষীদের নামের সম্বোধন ঘিরে বিতর্কে জড়িয়েছেন মোদী। কখনও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’, কখনও রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নামের আগে ‘স্বামী’ উপসর্গ জুড়ে দিয়েছেন তিনি। তা নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। এ বার রাজ্যবাসীকে পাঠানো খোলা চিঠিতেও স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা উল্লেখ করেন তিনি। বাঙালি মনীষীদের কথা উল্লেখ করে মোদী লেখেন, “সেই পূণ্যভূমিই অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং নারী নির্যাতনে কলঙ্কিত।” তিনি আরও লেখেন, “সোনার বাংলায় আজ ভুয়ো ভোটারের দাপট। নৈরাজ্যের অন্ধকারে ডুবতে থাকা পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে আজ সমগ্র ভারত চিন্তিত।”
রাজ্যবাসীর উদ্দেশে খোলা চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে তাঁরা এই ‘সমস্যা’ দূর করবেন। তিনি লেখেন, “আর কত দিন আমরা সহ্য করব?... আপনাদের সেবা করার একটি সুযোগের জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। এমন একটি সুযোগ, যেখানে কবিগুরুর ভাষায় ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’, সেখানে দুর্নীতি এবং অপশাসন থেকে মুক্তি মিলবে।”