মৃণালকান্তি দাস অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী।
যুদ্ধ কখনওই কাম্য নয়। যুদ্ধে বহু নিরীহের জীবন বিপন্ন হয়, বহু অর্থ ব্যয় হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতির উপরে। পাশ থেকে দেখা নয়, কার্গিলের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, যুদ্ধ না-হওয়াই শ্রেয়।
তবে যে দেশের সঙ্গে পুরোদমে যুদ্ধ হবে বলে আশঙ্কা, সেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে ভারতের জিততে বেশি সময় লাগার কথা নয়। তবে আশা করব, যে ভাবে ভারত শুধু জঙ্গি ঘাঁটিতে আক্রমণ করছে, তাতে পাকিস্তান পুরোদমে যুদ্ধে যাওয়ার সাহস করবে না৷
আমি ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনার অংশ ছিলাম। সেনার কর্পস অব সিগন্যালস-এর নায়েব সুবেদার পদে সিগন্যাল অপারেটর ছিলাম আমি। আমাদের কাজ ছিল সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ বজায় রাখা। যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে সামনে ও সবচেয়ে পিছনে আমাদের থাকতে হয়৷
যখন সেপ্টেম্বরে কার্গিলের যুদ্ধ হয়, তখন আমি জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুরে কর্তব্যরত ছিলাম। সেখান থেকে আমাদের একটি স্পেশাল কমিউনিকেশন ডিটাচমেন্ট নিয়ে পাঠানো হয় কার্গিল থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে কার্গিল জেলার পান্দ্রাস নামক একটি জায়গায়। ওখানেই ১৩ দিন আমাদের থাকতে হয়।
প্রথম কয়েক দিন আমাদের খুব আতঙ্কে কেটেছিল। হয়তো সবে খেতে বসছি, তখনই গোলাগুলি চলতে শুরু হল। ভেবেছিলাম আর বেঁচে ফিরব না৷ তবে কয়েক দিন পরে পুরো ভয়হীন হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, হয় জিতে ফিরব, নয় মরব।
আমরা ১৩টা দিন একটা টুকরিতে ছিলাম। কোনও মেস ছিল না। তাই ওই অবস্থাতেও নিজেদের রান্না করে খেতে হত। প্রথম কয়েক দিন আমরা সেটা করতে পারিনি। স্থানীয় কয়েকজন গ্রামবাসী আমাদের সন্ধ্যার সময় রুটি আর অরহড়ের ডাল দিত। আমরা ওঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, জঙ্গিরা ওদের গ্রামে আসে, নানা কিছু করে, কিন্তু ওঁরা প্রতিবাদ করেন না কেন? ওঁরা উত্তর দিয়েছিলেন, আপনারা দশ দিনের জন্য এসেছেন, ফের চলে যাবেন। কিন্তু আমাদের যেহেতু গ্রামে থাকতে হবে, তাই সমর্থনও করতে হবে। না হলে ওরা মেরে ফেলবে।
সে দিন বুঝেছিলাম, স্থানীয় কাশ্মীরিরা যুদ্ধ চান না, তাঁরাও শান্তিতে নিজেদের পরিবার নিয়ে থাকতে চান। তাঁরা ভারতেরই পক্ষে। কিন্তু পরিস্থিতির জন্যই তাঁদের নানা কাজ করতে হয় বা সমর্থন করতে হয়। শুধু খাওয়ার সমস্যা নয়, আমাদের সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট করেও রাখতে হত। রাতে অন্ধকারেই যাতায়াত করতে হত। গাড়িতেও ব্যাটারি আলো থাকত। কোনও জেনারেটর থাকত না৷ গাড়ির জানালাগুলিও কালো কাপড় বা কার্বন কাগজ দিয়ে ঢেকে দিতে হত। শৌচাগারে যেতে হলেও একটা সামান্য টর্চ জ্বালানোরও উপায় ছিল না।
আবারও বলছি, এই পরিস্থিতি তৈরি না হলেই ভাল। জীবন যাওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি গোলাবারুদ, গাড়ি, জ্বালানি, ট্রেঞ্চ বা বাঙ্কার তৈরি-সহ যুদ্ধে যা যা লাগে, তার খরচও প্রচুর। তাই যুদ্ধ না-হওয়াই ভাল।
আমার ছেলেও ভারতীয় সেনার সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিম দিকে পোস্টিং না-হলেও সবরকম পরিস্থিতির জন্যই তাঁদেরও তৈরি থাকতে হচ্ছে। আশা করব, যুদ্ধ হবে না, তবে ভারত যে ভাবে প্রত্যুত্তর দিচ্ছে, সেটা চলতে থাকবে।
অনুলিখন: সৌরভ চক্রবর্তী
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে