মায়ের ছবি হাতে ভোটদানের পথে অনুব্রত মণ্ডলের মেয়ে সুকন্যা। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।
তিহাড় জেলে সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল যা, মায়ের সেই ছবি নিয়েই বৃহস্পতিবার বোলপুরে ভোট দিলেন অনুব্রত মণ্ডলের কন্যা সুকন্যা। সর্বক্ষণ মেয়েকে আগলে রাখলেন জেলা তৃণমূলের কোর কমিটির আহ্বায়ক অনুব্রত ওরফে কেষ্ট। কিন্তু, সুকন্যা বেশি করে যেন আঁকড়ে থাকলেন মায়ের ছবিটাই।
গত বিধানসভা নির্বাচনে যাঁরা বাবা-মেয়েকে এক সঙ্গে ভোট দিতে দেখেছেন, তাঁরা বলছেন, দু’জনের বদল চোখে পড়ার মতো। বাবা আগের মতো ক্যামেরা দেখলেই ‘বাক্য বোমা’ ছোড়েন না। আঙুল উঁচিয়ে কথা বলার ভঙ্গি ছেড়ে অনেক সংযমী, হিসাবি। হওয়া গরম করার চেয়ে এই গরমে 'কুল থাকা'ই নাকি তাঁর বেশি প্রিয়। এ দিনও হালকা হলুদ রঙের পাঞ্জাবি ছিল অনুব্রতের পরনে। ভোট দিয়ে বেরিয়ে বললেন, ‘‘কুল থাকাই ভাল। কুল, কুল ভোট হচ্ছে।’’
অনুব্রত-কন্যা, বছর পঁয়ত্রিশের সুকন্যার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়, তিহাড় জেলে ১৫ মাস বন্দি থাকা, সে ভাবে দলের অনেককেই পাশে না পাওয়া নিয়ে তাঁর ক্ষোভ এখনও যায়নি। এক সময় নেতারা কেন বাবার পাশে থাকছেন না, তা নিয়ে বোলপুরের নিচুপট্টির বাড়িতে দলের মাথাদের ডেকে সরব হয়েছিলেন। সেই মেয়ে এ দিন ভোট দিয়ে বেরিয়ে বললেন, ‘‘কারও সঙ্গেই আর কথা বলতে ভাল লাগে না। অনেক কিছু বদলে গিয়েছে।’’ তিহাড় বদলে দিল? উত্তর আসে না। মা ছবি মণ্ডলের ছবি বসানো ফোটো ফ্রেম দেখিয়ে বলেন, ‘‘অনেক কঠিন সময়ে মা'কে পাইনি। মায়ের ছবি নিয়েই তাই এ বার ভোট দিতে এসেছি।’’
২০২০ সালে মারা যান অনুব্রতের ক্যানসার আক্রান্ত স্ত্রী ছবি। ২০২১ সালে মেয়েকে নিয়ে বাড়ির কাছে ভগবত নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে ভোট দেন অনুব্রত। ’২৩-এর পঞ্চায়েত বা ’২৪-এর লোকসভা ভোট দেওয়া হয়নি তাঁদের। কেটেছে জেলবন্দি অবস্থায়। তাঁর অনুগামীরাই বলছেন, ‘‘সেই লোক আর এই লোকের অনেক ফারাক!’’ ’২১-এ ‘নজরবন্দি’ থাকা অনুব্রতকে নজরে রাখতে রীতিমতো কালঘাম ছুটে গিয়েছিল নির্বাচন কমিশনের। অনুব্রতের কনভয় ধাওয়া করতে গিয়ে একাধিক বার পথ হারান নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা। ভোট শেষে বলে দিয়েছিলেন, "অনুব্রতকে চোখে চোখে রাখা অত সহজ নাকি? কনশিনের লোকেরা আমার পিছু নিয়ে একটু গা-গঞ্জ ঘুরে দেখল! যা-ই করুক, তৃণমূল দু'শোর উপর আসন পাচ্ছে। বিজেপি ১০০-র নীচে নেমে যাবে।’’ এ দিনও কেষ্টর দাবি, ‘‘তৃণমূল ২৫০। বিজেপি ৬০-এর নীচে নেমে যাবে। যা বলি মিলিয়ে দিই।’’
কিন্তু এই বলায় আগের ঝাঁঝ কোথায়?
স্থানীয়রাই বলছেন, ’২১ সালের ভোটে অনুব্রতের বাড়ি ঘিরে রেখেছিল শয়ে শয়ে তৃণমূল কর্মী। সকালে তাঁকে দেখতে যেতে হয়েছিল এক জন চিকিৎসককে। এরপর মেয়েকে একটি মোটরবাইকে তুলে, নিজে অন্য বাইকে উঠে পৌঁছে যান ভোটকেন্দ্রে। এ দিন সকাল ১০টাতেও নিচুপট্টির মণ্ডল বাড়ির সামনে কোনও ভিড় চোখে পড়ল না। বাড়ির সামনের রাস্তা খাঁ খাঁ করছে। কার্যত জনশূন্য চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা অনুব্রতের বাড়ি দেখলে মালুমই হয় না, অনুব্রতের কোনও নির্বাচনী ভূমিকা আছে!
সাড়ে ১০টা নাগাদ মেয়েকে নিয়ে অনুব্রত ভোট দিতে বেরোচ্ছেন, তখনও ভিড় নেই অনুগামীদের। একই চেহারা বোলপুরের ঝাঁ চকচকে তৃণমূল কার্যালয়ের সামনের রাস্তার। ভোট দিয়ে অনুব্রত সেখানে এসে বসার পরেও কার্যালয়ের চেহারায় তেমন কোনও বদল নেই। কেষ্ট-ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ মানছেন, দাদাকে ঘিরে এত দিন প্রত্যক্ষ করা বৃত্ত কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছে। ততক্ষণে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন অনুব্রত কন্যাও। এর পরের কয়েক ঘণ্টায় কার্যালয়ে নিজের ঘরে কেষ্ট ছাড়া রইলেন, তাঁর একান্ত আস্থাভাজন বিশ্বরূপ মণ্ডল।
শোনা যায়, যে কোনও বিতর্কিত প্রশ্ন ধেয়ে এলেই নাকি ‘চড়াম-চড়াম’, নকুলদানা, গুড়বাতাসার প্রবক্তা একবার দেখে নেন বিশ্বরূপের দিকে। তিনি 'অভয়' দিলে কথা চলে। নয়তো নেতা চুপ থাকার কৌশল নেন। সেই তরুণের ‘অভয়’ পেয়েই কেষ্ট বললেন, ‘‘নির্বাচন কমিশনের সব সাঁজোয়া গাড়ি বাঘে খেয়ে নেবে। এখানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আছে। কিন্তু, সেই টাইগার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুব্রত নয়!’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে