কিয়স্কে: লাভপুর হাসপাতালে লালারস সংগ্রহ। নিজস্ব চিত্র
ছিল তিন, হয়েছে ছয়। করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সাত দিনের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে জেলায়। সেটাই সবচেয়ে উদ্বেগে রেখেছে জেলা প্রশাসনকে। স্বাভাবিক ভাবেই চূড়ান্ত তৎপরতা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহলে।
পরিস্থিতি সামলাতে কী কী পদক্ষেপ করতে হবে বৃহস্পতিবার তা নিয়ে সবিস্তার আলোচনা হয়েছে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে। কোভিড হাসপাতালে ভর্তি আক্রান্তদের স্বাস্থ্যের খবর নেওয়া, আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা সকলকে চিহ্নিত করে লালারসের নমুনা সংগ্রহ করা, সংক্রামিতদের এলাকায় গতিবিধি কমানো-সহ নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ছিলেন জেলাশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, জেলা পরিষদের মেন্টর, তিন অতিরিক্ত জেলাশাসক, তিন মহকুমাশাসক ও স্বাস্থ্য আধিকারিকেরা। ওই তিন আক্রান্তের সংস্পর্শে কারা কারা এসেছেন, তা যুদ্ধকালীন ভিত্তিতে চিহ্নিত করে তাঁদের লালারসের নমনুা পরীক্ষার জন্য পাঠানোই আপাতত প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
প্রশাসনের একটি সূত্রে জানা যাচ্ছে, দুবরাজপুরে দু’জনের সংক্রমণ ধরা পড়ার পরেই দুবরাজপুর ব্লকে মা ও শিশুদের রুটিন টিকাকরণ কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছে। এক স্বাস্থ্যকর্তা বলছেন, ‘‘সরকারি হাসপাতালে ও নিভৃবাসে আক্রান্তদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করার জন্য বেশ কিছু চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন। তাঁদের সংস্পর্শে এসেছেন অন্যেরা। অনেকেই গৃহ পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। এই অবস্থায় মা ও শিশুর টিকাকরণ কর্মসূচি ঝঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া, যাঁদের হোম কোয়রান্টিনে রাখা হবে, তাঁদের উপরে নজরদারি চালানোর জন্যও কর্মীর প্রয়োজন।’’
গত ৩০ এপ্রিল রামপুরহাট মহকুমার ময়ূরেশ্বর ১ ব্লকে তিন করোনা আক্রান্তের হদিশ মিলেছিল। সাত দিন যেতে না যেতে বুধবার জেলার আরও তিন জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে। আক্রান্ত তিন জনের মধ্যে এক জন রামপুরহাটের, অন্য দু’জনের বাড়ি দুবরাজপুরের রামপুরহাটের ওই যুবক দিন কয়েক আগে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ থেকে ফিরেছিলেন নিজের গ্রামে। অন্য দিকে দুবরাজপুরের আক্রান্ত দু’জনের মধ্যে এক জন ক্যানসার আক্রান্ত বৃদ্ধ ও তাঁর ভাইপো। তাঁরা ফিরেছিলেন মুম্বই থেকে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, আক্রান্ত তিন জনকে বুধবারই বোলপুরে কোভিড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে ক্যানসার আক্রান্ত বৃদ্ধকে দুর্গাপুরের বেসরকারি কোভিড হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বৃহস্পতিবার।
উদ্বেগের বিষয় হল, যখন তিন জনের লালারাসের নমুনা সংগ্রহ হয়, তখন পর্যন্ত সকলেই ছিলেন সরকারি নিভৃতবাসে। কিন্তু, বুধবার রিপোর্ট আসার আগে আগের দিন, মঙ্গলবার বিকেলেই বাড়িতে পর্যবেক্ষণে থাকার পরামর্শ দিয়ে বছর আঠারোর যুবককে রামপুরহাট ১ ব্লকের কিসান মান্ডির সরকারি নিভৃতবাস থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। কেন এমন উদাসীনতা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। জেলা প্রশাসনের এক কর্তা জানান, অন্যদের সংক্রামিত করার আশঙ্কা থেকেই ওই গ্রামটিকে ২৪ ঘণ্টার পুলিশি নজরদারির মধ্যে আনা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর পরিবারের সদস্য,অ্যাম্বুল্যান্স চালক, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, নিভৃতবাসে ওই যুবকের সংস্পর্শে থাকা সকলের তালিকা তৈরি করে লালারসের নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ৩৩ জনকে নিভৃতবাসে রাখা হয়েছে।
একই ভাবে দুবরাজপুরের ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ ও প্রশাসন ৫৫ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে। বিডিও (দুবরাজপুর) অনিরুদ্ধ রায় জানান, সেই তালিকায় রয়েছেন আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা পরিবারের সদস্য, বক্রেশ্বরের যুব আবাসের নিভৃতবাসে থাকা অন্য আবাসিক, পুলিশকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসক। সকলকেই পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে লালা রসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করানো হবে।
ব্লক প্রশাসন সূত্রে খবর, বক্রেশ্বরের নিভৃতবাসে মোট ৩৩ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জনের করোনা টেস্ট হয়েছিল। ১৮ জনের নেগেটিভ হওয়ায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আক্রান্তদের পরিবারের ১২ জন সদস্য, দুবরাজপুর থানার ১৬ জন সিভিক ভলান্টিয়ার, দুই পুলিশকর্মী, দুই অ্যাম্বুল্যান্স চালক-সহ যাঁরা আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁদেরকে যুব আবাসের পাশে থাকা বক্রেশ্বর উন্নয়ন পর্যদের নতুন ভবনে রাখা হয়েছে।