শব্দের দাপটেও আশা আতসবাজি

ঐতিহ্যবাহী সোনামুখীর কালীভাসানে এ বারও দাপট ধরে রাখল শব্দাসুর। শব্দবিধির মাপকাঠির ডেসিবেলকে তুড়ি মেরে সাউন্ডবক্স আর মাইক বাজল বুধবার রাতভর।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০১৬ ০১:৫৬
Share:

বিসর্জনের দুই চিত্র। শোভাযাত্রায় বাজির রোশনাই। (ডান দিকে) সাউন্ডবক্স বাজিয়ে নাচ। সোনামুখীতে বুধবার রাতে তোলা নিজস্ব চিত্র।

ঐতিহ্যবাহী সোনামুখীর কালীভাসানে এ বারও দাপট ধরে রাখল শব্দাসুর। শব্দবিধির মাপকাঠির ডেসিবেলকে তুড়ি মেরে সাউন্ডবক্স আর মাইক বাজল বুধবার রাতভর। কোনও রকম আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে ফাটল লক্ষ লক্ষ টাকার নিষিদ্ধ শব্দবাজি। আর সবই ঘটল পুলিশের চোখের সামনেই! শব্দের ঠেলায় তালা লাগার আতঙ্কে দু’হাতে কান চেপে দাঁড়িয়ে প্রহর গুনলেন সোনামুখীবাসী।

Advertisement

কালী-কার্তিকের শহর সোনামুখী। এখানে কালীপুজো নিয়ে যতটা মাতামাতি হয়, কালীভাসানে তারও বেশি। বুধবার বিকেল থেকে ভাসানের তোড়জোড় শুরু হয়। চলে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত।

শহরের কয়েকশো কালীপুজো কমিটি প্রতিমা নিয়ে দশের বাঁধে ভাসান দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কোনও কমিটির বেশ কয়েকটি সাউন্ডবক্স ও মাইক নিয়ে গাঁক গাঁক করে গান বাজাতে বাজাতে পথে নেমেছিল। কোনও কমিটি আবার সঙ্গে তাসা, ব্যান্ড পার্টি নিয়েছিল। একে একে সব প্রতিমা নিয়ে আসা হয় সোনামুখী চৌমাথায়।

Advertisement

অভিযোগ, ওই চৌমাথা মোড়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে পুজো কমিটিগুলির শব্দবাজি ফাটানো পর্ব। সেই সঙ্গে মাইকে তারস্বরে বাজতে থাকে গান, ব্যান্ডপার্টির বাজনা। সেই সঙ্গে চলতে থাকে উদ্দাম নৃত্য। শুধু সোনামুখীই নয়, কালীভাসান উৎসবের এই মজা নিতে বাঁকুড়া জেলা তো বটেই, আশপাশের জেলা থেকেও বহু মানুষ আসেন।

বিষ্ণুপুরের যুবক সুমন্ত দাসের দাদার শ্বশুরবাড়ি সোনামুখীতে। কালী ভাসানের আগের রাতেই তিনি সেখানে গিয়েছেন। সুমন্তর কথায়, “বাজি ফাটানোটাই এখানকার আসল আকর্ষণ। শব্দবাজি, আতসবাজি সবই অন্য বার যেমন ফাটে, এ বারও তেমনই ফেটেছে।” কারও কারও শব্দের দাপটে সমস্যা হলেও অনেকে আবার জানাচ্ছেন, এসবের সঙ্গে তাঁরা অভ্যস্ত। তাঁদের ধাতে সয়ে গিয়েছে।

রাতভর কানফাটানো এই আওয়াজে অস্বস্তি হয় না? সোনামুখীর প্রবীণ বাসিন্দা অনিল প্রতিহারের কথায়, “এ তো আর আজকের উৎসব নয়। ছোট থেকেই দেখে আসছি। ভাসানের সময় রাতভর তীব্র শব্দে পটকা ফাটবে বা বক্স বাজবে এটা আমাদের কাছে অজানা নয়। মানসিক প্রস্তুতি থাকে।”

কালী ভাসান নিয়ন্ত্রণ করতে জেলার বিভিন্ন থানা থেকে এই বিশেষ দিনটিতে বহু পুলিশ আধিকারিককে সোনামুখীতে মোতায়েন করা হয়ছিল। এক পুলিশ আধিকারিকের কথায়, “তীব্র শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছে। চোখের সামনে কত যে পটকা ফাটল তার ইয়ত্তা নেই। ছেলে-ছোকরা থেকে বৃদ্ধ সকলেই দেখছি উৎসবের আমেজে মশগুল। কাকে আর নিষেধ করতে যাব?’’

সোনামুখীর কালী ভাসানের সঙ্গে শব্দাসুরের দৌরাত্ম্যের মিশেল দীর্ঘ কাল ধরে চলে এলেও ধীরে ধীরে মানুষ যে সচেতন হচ্ছেন, সে ছবিও এ বার সামনে এসেছে।

সোনামুখীর বহু পুজো কমিটিই এ বার শব্দবাজি ফাটানোর বিপক্ষে ছিলেন। সোনামুখীর অন্যতম প্রাচীন কালীপুজো ‘মাইতো কালী’র ভাসানে শব্দবাজির বদলে আতসবাজির রমরমা চোখে পড়েছে এ বার। শহরে সম্প্রীতির পুজো হিসেবে খ্যাত ‘ঘুঘু কালী’ পুজো কমিটির অন্যতম সদস্য পীরু কারক জানাচ্ছেন, ভাসানে যাতে শব্দবাজি ফাটানো না হয়, সে জন্য কমিটির সদস্যদের আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “সবাইকেই তো আর একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আমাদের কমিটির তরফে এ বার শব্দবাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সবাইকে আমরা রুখতে না পারলেও অনেকেই কিন্তু কথা রেখেছেন।” আগামী বছর শব্দবাজি রুখতে কমিটি আরও কড়া মনোভাব নেবে বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা ধীরে ধীরে হলেও বাড়ছে সোনামুখীর মানুষের একাংশের মধ্যে। সেই সচেতনতার প্রভাব আগামী বছর কালীপুজোর ভাসানে কতটা পড়ে সেটাই দেখার।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement