(বাঁ দিকে) নিতিন নবীন এবং সুকান্ত মজুমদার (ডান দিকে)। — নিজস্ব চিত্র।
বাঙালি মন্ত্রীর বাসভবনে বৈঠক ডেকে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাংসদদের কাজকর্মের খোঁজখবর নিলেন বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও উত্তরপূর্ব উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের দিল্লির বাসভবনে বৈঠকে বসেন নিতিন। আমন্ত্রিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকেরাও। ঘণ্টা দুয়েকের বৈঠকে সাংসদদের কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিষয়ে বিশদ খোঁজখবর তো নিতিন নিয়েছেনই, তার ভিত্তিতে নির্ধারণ করে দিয়েছেন আসন্ন নির্বাচনে সাংসদদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকাও।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে লোকসভায় রয়েছেন বিজেপির ১২ জন সাংসদ। আর রাজ্যসভায় রয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য, অনন্ত মহারাজ এবং মনোনীত সাংসদ হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। এই ১৫ জনই মঙ্গবারের বৈঠকে আমন্ত্রিত ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ বৈঠক শুরু হয়। চলে প্রায় সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। অনন্ত ছাড়া বাকি সকলেই বৈঠকে হাজির ছিলেন। আর পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সুনীল বনসল, ভূপেন্দ্র যাদব, বিপ্লব দেব, অমিত মালবীয় বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। বিহার বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে ব্যস্ত থাকায় সে রাজ্যের মন্ত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত আর এক পর্যবেক্ষক মঙ্গল পাণ্ডে বৈঠকে যোগ দিতে পারেননি। আর অনন্ত আনন্দবাজার ডট কমকে ফোনে জানিয়েছেন, সামাজিক অনুষ্ঠানের কারণে সংসদের অধিবেশন থেকে ছুটি নিয়ে তিনি কোচবিহারে ছিলেন। সেই কারণে দিল্লির বৈঠকে মঙ্গলবার থাকতে পারেননি। তবে বুধবার থেকে অধিবেশনে যোগ দেবেন।
বৈঠকের আলোচ্যসূচি নিয়ে কেউই বিশদে মুখ খুলতে চাননি। তবে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি যে রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক ভাষ্য সম্পর্কে বিশদে খোঁজখবর নিয়েছেন, সে কথা সাংসদেরাই জানিয়েছেন। সে সবের ভিত্তিতে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির কী করণীয়, তা নিয়ে নিতিন কিছু পরামর্শ তথা নির্দেশও দিয়েছেন। তবে বিজেপি সূত্রের খবর, বৈঠকের অধিকাংশ সময়ই খরচ হয়েছে সাংসদের কাজকর্মের এলাকাভিত্তিক হিসাব দেওয়া-নেওয়ায়। অর্থাৎ, কোন সাংসদ নিজের এলাকায় কী কাজ করছেন? তিনি নিয়মিত কোন ধরনের কর্মসূচির আয়োজন করে থাকেন? সম্প্রতি কী ধরনের কর্মসূচির আয়োজন হয়েছে? আর কোন কোন কর্মসূচি হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে? প্রত্যেকের কাছ থেকে নিতিন এই সব তথ্য নিয়েছেন বলে বিজেপি সূত্রের খবর। কার এলাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন, সংগঠনের অবস্থা কী, সে সবও বিশদে জেনেছেন। প্রত্যেক সাংসদের এলাকায় ক’টি করে বিধানসভা আসনে দলের পরিস্থিতি ভাল, সে সবও জানতে চান নিতিন। নির্বাচন পর্যন্ত জনসংযোগ আরও বাড়াতে সাংসদদের কী করা উচিত, ভোটের প্রস্তুতি ও প্রচার পর্বে সাংসদদের কী ধরনের দায়িত্ব নিতে হবে, তার রূপরেখাও নিতিন বৈঠকে কিছুটা বুঝিয়ে দিয়েছেন বলে বিজেপি সূত্রের দাবি।
বিজেপির একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য জনসংযোগ বৃদ্ধির যে সব কর্মসূচি ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়েছে, সে সব কোন সাংসদের এলাকায় কেমন চলছে, তা নিয়েও নিতিন বিশদে খোঁজখবর নিয়েছেন। সাংসদরা নিজেরা তাতে কতটা অংশ নিচ্ছেন, জানতে চেয়েছেন সর্বভারতীয় সভপতি। যদি এখনও পুরোপুরি সে অভিযানে তাঁরা শামিল না-হয়ে থাকেন, তা হলে অবিলম্বে শামিল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারি মাসে মাইক বাজিয়ে সভা-সমাবেশ করা যাবে না বলে কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে ছোট ছোট বৈঠক করতে বলেছেন। আর নিজের নিজের এলাকার বাইরের কিছু এলাকাতেও ভোট প্রস্তুতির কাজে সাংসদদের সক্রিয় হতে বলেছেন নিতিন।
বৈঠকের মুহূর্ত। — নিজস্ব চিত্র।
বৈঠকটি হয়েছে সুকান্তের বাংলোর প্রশস্ত অফিসঘর তথা বৈঠকখানাতেই। বাইরের লনে তাঁবু খাটানো হয়েছিল নৈশভোজের জন্য। মূলত বাঙালি নেতাদের জমায়েত বলে আমিষ পদের বাহুল্যই ছিল বেশি। ইলিশ ভাপা, দই কাতলা, এঁচোড় চিংড়ি, মুরগির মাংস, খাসির মাংস— সব রকমই ছিল পাতে। তবে বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন আমিষ খান কি না, সে বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারা নিশ্চিত ছিলেন না। নিতিনের রাজ্য বিহারে আমিষ খাওয়ার প্রচলন যথেষ্ট হলেও নিরামিষাশীও অনেকেই রয়েছেন। তা ছাড়া সুনীল বনসল, ভুপেন্দ্র যাদব, মঙ্গল পাণ্ডে, অমিত মালবীয়দেরও আমিষ চলে না। তাই নিরামিষ আহারে ছিল ঢেঁড়স পোস্ত, পনির মসালা, নবরত্ন ডাল, বেগুনি এবং এঁচোড়ের ডালনা। বৈঠকে আমন্ত্রিতদের অধিকাংশই ডায়াবিটিস সংক্রান্ত বিধিনিষেধ মেনে চলেন। তাই আলু-পোস্তর বদলে গৃহকর্তা সুকান্ত ঢেঁড়স-পোস্তর ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু রক্তে শর্করা বাড়ার আশঙ্কাও শেষ পাতে গুড়ের রসগোল্লাকে আটকাতে পারেনি।
গত ২০ জানুয়ারি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি হয়েছেন নিতিন। দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দিনে প্রথম বৈঠকটিই করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতৃত্বের সঙ্গে। তার এক সপ্তাহের মাথায় প্রথম রাজ্য সফরে বেরোন তিনি এবং গন্তব্য ছিল সেই পশ্চিমবঙ্গ। গত ২৭ এবং ২৮ জানুয়ারি দুর্গাপুর এবং রানিগঞ্জে কর্মিসভা করেন তিনি। তার পরে এক সপ্তাহও কাটেনি। ফের পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সঙ্গে নিতিন বৈঠক করলেন। সংসদের অধিবেশন চলছে বলে সাংসদেরা সকলেই দিল্লিতে। রাজ্য সভাপতি শমীকও সাংসদ হওয়ার সুবাদেই যে দিল্লিতে থাকবেন, তা-ও নিতিন জানতেন। তাই আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে রাজ্য সভাপতি এবং সাংসদদের সঙ্গে আরও একদফা আলোচনা সেরে নেওয়ার সুযোগ নিতিন ছাড়তে চাননি।