ভোটের লাইনে মহিলারা। ছবি: শুভ্র মিত্র।
মহিলা ভোটকে পাখির চোখ করে এ বার নির্বাচনী প্রচার সেরেছে দুই যুযুধান দল তৃণমূল ও বিজেপি। নির্বাচনের পরে দেখা যাচ্ছে, বাঁকুড়া জেলায় ভোটদানে শতাংশের নিরিখে পুরুষদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে মহিলারা। জেলার ১২টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০টিতেই এ বার পুরুষদের তুলনায় মহিলা ভোট বেশি পড়েছে। ফলে নারী মন এ বার কোন দল পেয়েছে, তা নিয়ে চর্চা চলছে জেলার রাজনৈতিক মহলে।
উত্তমকুমারের শেষ ছবি ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-তে কিশোর কুমারের সেই গান ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল, কিছুই বুঝতে পারবে না...’ আজও সমান জনপ্রিয়। এ বার বাংলার রাজনৈতিক দলগুলির ভোট ভাগ্য অনেকাংশে মহিলা ভোটারদের উপরে নির্ভরশীল হয়ে ওঠায় ভোটের অঙ্কও জটিলতর হয়ে উঠেছে।
২০২১ সালে বিধানসভা ভোটের আগে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের কথা ঘোষণা করার পরে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া ঘুরিয়ে রাজ্যে ক্ষমতা ধরে রাখে তৃণমূল। এ বার ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লক্ষ্মীর ভান্ডারের অনুদান বৃদ্ধি করে বড় চমক দেন। মহিলারা উচ্ছ্বাসও দেখিয়েছিলেন।
কিন্তু বিজেপি রাজ্যে সরকার গড়লে ওই প্রকল্পে দ্বিগুণ অনুদানের কথা ঘোষণা করে বাড়ি বাড়ি মাতৃশক্তি ভরসা কার্ড বিলি করায় মহিলাদের একাংশ তা বিশ্বাস করতে শুরু করেন। পাল্টা তৃণমূলও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মহিলাদের এমন কোনও অনুদান দেওয়া হচ্ছে না বলে পাল্টা প্রচারও চালায়। অনুদান প্রকল্পকে ঘিরে দুই দলের প্রচারে মহিলা ভোটারদের একাংশের মন দোদুল্যমান অবস্থায় ছিল। শেষে ইভিএমের সামনে গিয়ে তাঁরা কোন ফুলে আস্থা রেখেছেন, তা নিয়ে চর্চার শেষ নেই।
২০২১ সালে ভোটের আগে লক্ষ্মীর ভান্ডারের কথা তৃণমূল ঘোষণা করলেও অনুদান দেওয়া শুরু হয়েছিল নির্বাচনের পরে। সেবার জেলার ১২টি কেন্দ্রের মধ্যে চারটিতে জেতে তৃণমূল, বাকি আটটি পায় বিজেপি। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল লক্ষ্মীর ভান্ডারের কথা প্রচারের সামনে আনলেও বিজেপির একাংশ বরং এর বিরোধিতা করেছিলেন। বিজেপি ওই প্রকল্পের বিরোধী বলে সে বারের প্রচার চালায় তৃণমূল।
সে বার বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্র জেতে তৃণমূল। বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্র অল্প ব্যবধানে বিজেপি জেতে। তবে বিধানভিত্তিক ফলাফলে জেলায় ১২টি কেন্দ্রের ছ’টিতেই তৃণমূল এগিয়েছিল। ওই সময়ে জেলায় লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্পের উপভোক্তা ছিল প্রায় ন’লক্ষ। প্রশাসনের হিসেবে এ বার সেই উপভোক্তার সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাপিয়ে গিয়েছে।
ওই প্রকল্প ভর করে তৃণমূল ভোটে জেতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হলেও উপভোক্তাদের মধ্যে থেকে এ বার নির্বাচনের আগে থেকেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে। যা শাসকদলের পক্ষে স্বস্তিদায়ক না-ও হতে পারে। ছাতনার গুড়পুতার সুমিত্রা বাউরি বলেন, “আমি, জা ও শাশুড়ি মিলে তিন জনে মাসে ১৭০০ টাকা করে লক্ষীর ভান্ডারের অনুদান পাচ্ছি। সংসার চালাতে এই টাকা আমাদের বড় সহায়।” একই কথা জানাচ্ছেন ওই গ্রামের বধূ রীনা বাউরি, দীপালি বাউরিরাও। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই গ্রামের কয়েকজন বধূর আশা, বিজেপি জিতলে তাঁরা দ্বিগুণ অনুদান পাবেন।
আবার বাঁকুড়ার বিকনা নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের বুথে ভোটের লাইনে দাঁড়ানো এক বধূ বলেন, “বিজেপি মহিলাদের দ্বিগুণ টাকা দেবে বলছে বটে, তবে বেশি লোভ কি ভাল! কথায় আছে, হাতের লক্ষ্মী পায়ে ফেলতে নেই। যেটুকু পাচ্ছি, তাতেই সন্তুষ্ট আছি।’’
আবার প্রত্যন্ত রানিবাঁধের তুংচাঁড়োর কয়েকজন বধূরা জানাচ্ছেন, আগে তাঁরা সিপিএমকে ভোট দিতেন। লক্ষ্মীর ভান্ডার পেয়ে গতবার তাঁরা তৃণমূলকে ভোট দেন। এ বার তাঁরা ভাতা বেশি পাওয়ার আশায় বিজেপিকে ভোট দেবেন বলে জানান। তাঁরা বলেন, ‘‘দেখিই না বিজেপি কি করে। না হলে পাঁচ বছর পরে আবার পাল্টে দেব।”
বিজেপির বাঁকুড়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বিজেপি ক্ষমতায়এসে মহিলাদের দ্বিগুণ ভাতা দেবে। সে জন্য আমরা তাঁদের ভরসা কার্ড দিয়েছি। সেই কার্ড বিলির সময়ে এবং বুথে মহিলাদের যে উচ্ছ্বাস আমরা দেখেছি, নিশ্চিত রাজ্যে এ বার পরিবর্তন হচ্ছেই।’’
তা মানতে নারাজ তৃণমূলের বাঁকুড়ার সাংসদ অরূপ চক্রবর্তী। তাঁর দাবি, “লক্ষ্মীর ভান্ডারের উপভোক্তাদের ভোট একচেটিয়া ভাবে অতীতের নির্বাচনগুলিতে তৃণমূলের পক্ষেই গিয়েছে। এ বারও সেটাই হবে, আমরা নিশ্চিত।”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে