চর্চা: চলছে পড়াশোনা। নিজস্ব চিত্র
মধ্যিখানে গুরুমশাই— ঘিরে রয়েছে বিদ্যার্থীরা। চর্চা চলছে সংস্কৃতের। যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা দৃশ্য।
সিউড়ির বড় কালীবাড়ীতে এখনও এমনই টোল বসে। জেলার এই উদ্যোগের শুরু সিউড়ির মুখ্যোপাধ্যায় পরিবারের হাত ধরে। আনুমানিক ১৮৭৪ সালে তন্ত্রসাধক কালীপ্রসাদ বাঁকুড়ার ময়নাপুর থেকে সিউড়িতে এসে কালী সাধনায় সফল হয়ে মা ভবতারিনীর কৃপা লাভ করেন। দু’বছর পরে মা ভবতারিনীর প্রতিমা তৈরি করিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন চৈত্র সংক্রান্তির দিনে। কুলদানন্দের সুপুত্র দক্ষিনারঞ্জন ছিলেন মাইকেল মধুসুদন দত্তের বন্ধু। তাঁর হাত দিয়েই বীরভূমের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা দিবাকর এর আত্মপ্রকাশ হয়। ১৯৪০ সালে তাঁর স্ত্রী শঙ্করীবালার মৃত্যুর পরে তাঁর নামে কালীমন্দির প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হল শঙ্করী চতুষ্পাঠী।
১৯৪৩ সালে, পারিবারিক ইতিহাস সে কথাই বলে। সে সময় বীরভূমের সংস্কৃত শিক্ষা পরিষদের সম্পাদক ছিলেন তিনি। শুরু হল পঠন পাঠন। পুরানো নিয়ম মেনে সংস্কৃতে আদ্য, মধ্য, উপাধি পাঠ্যক্রমে পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা ছিল। সেখানো হত পুজো করাও। প্রাচীন পরম্পরা মেনে ছাত্ররা গুরু গৃহে থেকে খেয়ে পড়াশোনা করতেন, ঠিক যেমনটা হত আগের দিনে। অতীত বাংলার ইতিহাস বলে টোলের পণ্ডিতরা সে সময় ছাত্রদের ব্যাকরণ, অলঙ্কার, পৌরানিক কাব্য, স্মৃতি, সাহিত্য প্রভৃতি শিক্ষা দিতেন সিউড়ির মুখ্যোপাধ্যায় পরিবার ও সেই আর্দশে অনুপ্রাণিত হয়ে চলতেন। চতুষ্পাঠীর চলার পথ সুগম ছিল না। বেশ কিছু দিন পরে উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে বিশেষ করে সংস্কৃত পণ্ডিতের অভাবে সাময়িক ভাঁটা পড়ে পঠনপাঠনে।
অমিতারঞ্জনের দুই ছেলে সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ দেবরঞ্জন ও রমারঞ্জন এর চেষ্টায় ১৯৮৭ সালে তখনকার বঙ্গীয় শিক্ষ পরিষদের সচিব অনন্তলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় আবার পথচলা শুরু হয়। তখন প্রতিষ্ঠানের সম্পাদনার ভার নেন উত্তরসূরি পার্থসারথী মুখ্যোপাধ্যায়, পঠনপাঠন চলে সংস্কৃত পণ্ডিত পার্বতী শঙ্কর ভট্টাচার্যের হাত ধরে। যিনি বেণীমাধব ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক ছিলেন। এক সময় সংস্কৃত ভাষার জনপ্রিয়তা কমতে থাকলে এই প্রথাগত শিক্ষাকে আধুনিকতার মোড়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে উদ্যোগী হলেন রমারঞ্জনবাবু। সে সময় কেন্দ্রায় শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য হিসাবে তাঁর চেষ্টাতে সিউড়ির শঙ্করী চতুষ্পাঠী রাষ্ট্রীয় সংস্কৃত সংস্থানের মান্যতা পায়। লোক-গবেষক আদিত্য মুখ্যোপাধায় বলেন “এক সময় বীরভূমের সাঁইথিয়া, জুবুটিয়া প্রভৃতি জায়গায় টোলে পড়াশোনা হতো তবে সেগুলি আর চালু নেই। সিউড়িতে মুখ্যোপাধ্যায় পরিবারের চেষ্টাতেই এই প্রাচীন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে আজও।”
সম্পাদক তথা সিউড়ির বীরভূম মহাবিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ পার্থসারথীবাবুর দাবি “আধুনিক কালেও চতুষ্পাঠীর প্রয়োজন রয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম ধারক সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণগত বুনিয়াদ আর পাঠ্য বিষয়ের সবিস্তার ব্যাখ্যার ফলে ছাত্রদের ভাষা জ্ঞান দৃঢ় হয়। যা আজকের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও জরুরি। তবে আজকাল উপযুক্ত পণ্ডিতের অভাব একটা বড় প্রতিবন্ধকতা।’’