সারি সারি রিকশা চলেছে পথে। এটাই রোজকার ছবি।—নিজস্ব চিত্র
বেলা পৌনে ১২টা। সবে পুরুলিয়া স্টেশনে ঢুকেছে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস। স্টেশন থেকে বেরিয়ে রিকশা স্ট্যান্ডে এসে দুই যাত্রীর জিজ্ঞাসা— ‘‘সিধো-কানহো-বীরসা ইউনিভার্সিটি যাব, কত ভাড়া?’’ ভাড়া শুনেই আঁতকে ওঠেন দুই যাত্রী— ‘‘বলেন কী ১০০ টাকা!’’ তাঁদেরই একজন জানান, তাহলে অটো বা টোটোতে করেই তাঁরা যাবেন। তাই শুনে রিকশাচালকদের হাসাহাসি— ‘‘এখানে ওসব টোটো-অটো চলে না। আপনি না হয় পাঁচ টাকা কম ভাড়া দেবেন। চলুন।’’ অগত্যা রিকশাতেই চড়তে বাধ্য হন ওই দুই যাত্রী। আর রাত হলে ভাড়া দেড় গুণ পর্যন্ত চড়ে যায়।
পুরুলিয়া শহরে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এখনও শুধুই রিকশা। দিনে দিনে বাড়ছে শহরের পরিধি, বাড়ছে জনসংখ্যা, বসতিও। কিন্তু রিকশা ভিন্ন সাধারণের জন্য অন্য কোনও যান এখানে চলে না। কিন্তু বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি, অটো চালু হোক। ইদানীং যোগ হয়েছে দূষণহীন ব্যাটারি চালিত টোটো চালানোর দাবি।
তবে এ বার বাসিন্দাদের আক্ষেপ দূর হতে চলেছে। নতুন বছরে পুরুলিয়া পুরসভা ও প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে শহর ও শহরতলির মধ্যে এ বার টোটো চালানো হবে। ইতিমধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে একটি বৈঠকও হয়ে গিয়েছে। সেখানেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
পুরুলিয়ার আঞ্চলিক পরিবহণ আধিকারিক অনির্বাণ সোম বলেন, ‘‘শহরের রাস্তায় টোটো চালানো হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। তবে কোন রাস্তায় চলবে তা পুরসভাকে ঠিক করতে বলা হয়েছে।’’ জেলা পরিবহণ বোর্ডের সদস্য সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, শুধু পুরুলিয়া শহরই নয়, শহরতলিতেও টোটো চালানো হবে। তবে কোন কোন রুটে চলবে, কত ভাড়া হবে, কোথায় স্ট্যান্ড হবে তা পুরসভাকে জানাতে বলা হয়েছে। পুরসভা এই বিষয়গুলি জানালে তারপর ফের বৈঠক করে কোন রুটে টোটো চলবে, কত ভাড়া ইত্যাদি জানানো হবে। পুরসভার তরফে বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান-ইন কাউন্সিল বৈদ্যনাথ মণ্ডল বলেন, ‘‘শহরে কতগুলি রুট হবে বা কোথায় স্ট্যান্ড হবে তা ঠিক করতে আমরা শীঘ্রই বৈঠকে বসছি।’’ পুরুলিয়ার পুরপ্রধান তথা বিধায়ক কে পি সিংহ দেও জানিয়েছেন, পুরসভা প্রশাসনকে সব রকমের সহায়তা করবে।
পুরুলিয়া কনজিউমার অ্যাসোশিয়েশনের সভাপতি তথা প্রাক্তন অধ্যাপক আবু সুফিয়ান জানিয়েছেন, তাঁরা ডিস্ট্রিক্ট কনজিউমার প্রোটেকশন কাউন্সিলের বৈঠকে একাধিকবার দাবি জানিয়েছেন শহর বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় দূরত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনই সেই পথ রিকশায় যেতে সময় বেশি লাগছে, ভাড়াও অনেক গুণতে হচ্ছে।
তাঁর দাবি, ‘‘রিকশা থাক, তার পাশাপাশি টোটো বা ই-রিকশা চালানো হোক। তা ছাড়া, কেন্দ্রীয় সরকার ই-রিকশা বৈধতা দিয়েছে। আর রাজ্য সরকারও রাজ্যে ই-রিকশা চালানোর ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধে নেই বলে সরকারি ভাবে নোটিস জারিও করেছে। তার পরেও কেন এত সময় লাগাছে জানি না।’’
জেলা পরিবহণ বোর্ডের সদস্য সুজয়বাবু জানিয়েছেন, বিভিন্ন রুটে যে সমস্ত টোটো চলাচল করবে তাদের পরিবহণ দফতরের আগাম অনুমতি নিতে হবে। রাজ্য সড়ক বা জাতীয় সড়কে টোটো চলার অনুমতি নেই। তবে রাজ্য বা জাতীয় সড়ক পারাপার করার ক্ষেত্রে টোটোর কোনও বাধা নেই।
বাসিন্দাদের অনেকই অবশ্য রিকশা ভাড়া নিয়ে জেরবারের মধ্যে টোটো চলার খবরে খুশি। যেমন শহরতলির বাসিন্দা নমিতা গড়াই, অনুরূপা মণ্ডলদের কথায়, ‘‘সন্ধ্যার পরে শহরতলির বাসিন্দাদের বাড়ি ফিরতে খুবই অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়। টোটো চললে তো ভালই হয়।’’ এক স্বস্তির কথা শুনিয়েছেন আদ্রার বাসিন্দা মুনমুন ঘোষাল। তিনি জানান, পুরুলিয়া শহরে গেলে রিকশা ছাড়া গতি নেই। এ বার হয়তো ছবিটা বদলাবে।
টোটো পথে নামার খবরে শহরবাসীর উৎসাহ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু, বিভিন্ন জেলার বাস্তব অভিজ্ঞতা মাথায় রাখলে পুরুলিয়ায় জেলা প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণও হয়ে উঠতে পারে এই দূষণহীন যান। নির্দিষ্ট সংখ্যায় টোটো নামানোর কথা প্রশাসন বললেও শেষ অবধি দেখা গিয়েছে, অনুমোদন হীন বহু টোটোই রাস্তায় চলছে। এটাও ঘটনা যে, টোটো রাস্তায় নামার পরে অনেক জায়গাতেই রোজগার কমেছে বিশেষ করে রিকশা ও অটোচালকদের। এর অনিবার্য পরিণাম হিসাবে হাওড়া-হুগলি-বীরভূম-বর্ধমান-উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন শহর ও শহরতলিতে টোটো চালকদের সঙ্গে অটো বা রিকশাচালকদের বচসা বেধেছে একাধিকবার। বচসা থেকে কোথাও কোথাও হাতাহাতিও হয়েছে। হয়েছে পথ অবরোধ।
পুরুলিয়ার মতো রিকশা-প্রধান শহরে টোটো নামলে যে এই ধরনের সংঘাত বাধবে না, তার নিশ্চয়তাও নেই। শহরের রাস্তায় টোটো চালানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সিটু নেতা তথা পুরুলিয়ার প্রাক্তন পুরপ্রধান বিনায়ক ভট্টাচার্য। টোটো চালানোর সিদ্ধান্ত সময়োপয়োগী বলে তাঁর মত। তবে, একই সঙ্গে তাঁর আশঙ্কা, ‘‘এই শহরে লাইসেন্স ধারী ও লাইসেন্স বিহীন কমবেশি ১২ হাজার রিকশা রয়েছে। টোটো পথে নামলে অনেক রিকশা চালক রুজি হারাবেন। কিছুদিনের মধ্যেই শহরে একটা ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হবে। তাই রিকশা চালকরা কী করবেন, সেটাও প্রশাসনের দেখা দরকার।’’
প্রশাসন কী ভাবে এই পরিস্থিতি সামলায়, সেটাই দেখার। তবে, ইচিবাচক দিক হল, কমবয়সী রিকশাচালকদের অনেকেই জানিয়েছেন, প্রশাসন থেকে সহজ উপায়ে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে তাঁরা টোটো কিনে পথে নামবেন।