কারও ভরসা শিব, কারও ঘুমের ওষুধ

‘‘ছেলে তো জিতবে। কিন্তু সরকারটা থাকবে তো! তা না হলে ওর জিতে আর কী লাভ?” টিভিতে চোখ রেখে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা বলে চললেন, ‘‘৭৭ সাল থেকে ওকে দেখছি।

Advertisement

অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০১৬ ০৪:৩৫
Share:

আদালতের কাজে ব্যস্ত মিল্টন রশিদ।

‘‘ছেলে তো জিতবে। কিন্তু সরকারটা থাকবে তো! তা না হলে ওর জিতে আর কী লাভ?”

Advertisement

— টিভিতে চোখ রেখে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা বলে চললেন, ‘‘৭৭ সাল থেকে ওকে দেখছি। মিথ্যে বলব না, কোনও বার ওর জেতা নিয়ে এত চিন্তা করিনি। তবে আগে তো বরাবর কংগ্রেস থেকে জিতে এসেছে। এ বার নতুন দলে। তাই ওর চিন্তাটাও একটু বেশি।”

বৃদ্ধার নাম ফজলেতুন্নেসা বিবি। তিনি বলে চলেছেন তাঁর ‘সম্পর্কিত’ ছেলে, হাঁসনের তৃণমূল প্রার্থী অসিত মালের সম্পর্কে। পরপর দু’টি মন্তব্য তাতেই স্পষ্ট তিনি তো বটেই, চিন্তায় অসিতও। রামপুরহাট পুরসভার ১০ ওয়ার্ডের ডাক্তারপাড়া এলাকায় চিকিৎসক গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ফজলেতুন্নেসা বিবি পুত্রসম অসিতের বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত ঘুমাতে যান না। ভোট পেরোলেও উৎকণ্ঠায় তিনি।

Advertisement

কেন চিন্তা?

রাখঢাক না রেখেই বললেন, ‘‘এ বার অসিতের বিরুদ্ধে মিল্টন রশিদ প্রার্থী। মিল্টন তো অসিতকে দেখে বড় হয়েছে। ঘরে ঘরে লড়াই বলেই চিন্তা।’’ মন্তব্যগুলি শুনে বিরোধিতা তো দূর, জানালেন আরাধ্য দেবতা শিবের পুজো করছেন অসিত। তাঁর কথায়, ‘‘আমি শিবকে মানি। পরের সেবায় যেন নিজেকে নিযুক্ত রাখতে পারি সেই প্রার্থনাই করি।’’

Advertisement

মোবাইলে নজর অসিত মালের।

অবশ্য ‘ধার্মিক’ পরিচয় নিয়ে অসিতবাবুর কোনও মাথাব্যথা নেই। নিজেকে বরং বাস্তববাদী বলেই দাবি করে থাকেন। ভোটের হাওয়া কী বুঝছেন? অনুগামীদের প্রশ্নের মুখে অসিত বলছিলেন, “ভোট মিটে যাওয়ার পরে যাঁরা বলেন অমুক বুথে আমাদের লিড কম হবে। ওটায় ভাল হবে। সে রকম কাঁচা কর্মীদের আমি পছন্দ করি না।” কিছু ক্ষণ কথাবার্তার পরে সেই অসিতই বলে বসলেন, ‘‘ভোট মিটে যাওয়ার পরে আমাদের একটা অঙ্ক তো মেলাতেই হয়। এ বারও আঁক কষে জয়ের ব্যবধান নিয়ে কাটা ছেঁড়া করছি।” কথা দু’টো পরস্পর বিরোধী হল না? অসিত অবশ্য তেমনটা মানতে চাইলেন না।

ব্যাপারটা খোলসা করলেন এক অনুগামী। অকপটে বললেন, ‘‘সত্যি বলতে কি, দাদা একটু চাপে রয়েছেন। তাই দু’রকম করে ফেলছেন।’’

বস্তুত, বীরভূমে ভোট হয়েছে ১৭ এপ্রিল। আর ফল প্রকাশ হওয়ার কথা ১৯ মে। মাঝে রয়েছে ৩২ দিন। পরীক্ষা আর ফলের মধ্যের ব্যবধানই চিন্তায় রাখছে প্রার্থীদের। একই অবস্থা অসিতের প্রতিদ্বন্দ্বী তথা জোট প্রার্থী মিল্টনের। ফল কী হতে পারে? ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে দেখা হলেই সে প্রশ্ন রাখছেন চাইছেন তিনি। কোথায়, এগিয়ে থাকবেন, কোথায় পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, দু’য়ে মিলে জিত আসবে কিনা চলছে তার চুলচেরা বিচার, আলোচনা, তর্ক।

সে সব মেনেও নিচ্ছেন তিনি। পেশায় আইনজীবী এই প্রার্থী টেনশনের কথা বলতে গিয়ে উদাহরণও টেনেছেন পেশার আঙিনা থেকে। বলছেন, ‘‘৩০২ ধারায় মার্ডার কেসের মামলায় জামিন হবে না জেনেও মক্কেলের হয়ে লড়াই করতে হয়। প্রথম ভোটের ময়দানে বড় একটা লড়াইয়ে নেমেছি। জেতা-হারা পরের ব্যাপার। কিন্তু, ফল নিয়ে উৎকণ্ঠা থাকবে না?’’ যোগ করছেন, ‘‘অনেক দিন থেকেই একটা করে ঘুমের ওষুধ খাই। ভোটপর্ব মিটতে দেড়খানা করে খাচ্ছি।’’

ভোটের আগে প্রায় এক মাস দোকানপাট বন্ধ করে মিল্টনের হয়ে এলাকা চষেছেন বাবা আব্দুর রশিদ। তিনি ছেলের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তবে ছেলের ভাল ফলের আশায় ঘুম উবেছে মিল্টনের মা ফাতেহাতুল মাওলার। স্বামীর মঙ্গল কামনায় নমাজের সময় বাড়িয়ে দিয়েছেন মিল্টনের স্ত্রী সালমা বিবি। জানালেন, পাঁচ ওয়াক্ত নমাজে স্বামীর জন্যে দোওয়া চাইছি।

একই ভাবে চিন্তিত বিজেপি প্রার্থী রূপা মণ্ডলও। রূপা-ঘনিষ্ঠ এক কর্মীর কথায়, ‘‘দিদির চিন্তাটা অন্য। কংগ্রেস বা তৃণমূল প্রার্থীরা যখন জয় নিয়ে আশাবাদী তখন দিদির চ্যালেঞ্জ লোকসভার ভোট ধরে রাখা।’’ তেমন কথা উড়িয়ে দিয়ে জোর গলায় জেতার কথা শুনিয়েছেন রূপাও।

ছবি: সব্যসাচী ইসলাম।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement