বিষ্ণুপুর ব্লকের মড়ার গ্রামে ভোটের মাঝে মুড়ি খাওয়া চলছে। নিজস্ব চিত্র ।
রাস্তার ধারে বাঁশ, ত্রিপলে ঢাকা ছাউনি। বিধানসভা তালড্যাংরা। পিছনে তৃণমূলের শীর্ষনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রার্থীর ছবি দেওয়া ব্যানার। হাত-পা ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে মুড়ি খাচ্ছেন জনা তিনেক যুবক। শরীরের ভাষায় আলস্যই নজর কাড়ে।
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) আবহে এ বারের ভোটের ‘ভোল্টেজ’ বেশ চড়া। মমতা বা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতায় উত্তাপ বাড়ছে। কিন্তু বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের ভোটে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন তল্লাটেই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের শরীরে যেন আলসেমি ধরা পড়েছে। অনেকের সঙ্গে কথা বলে মনে হল, যেন ভোট নিয়ে উৎসাহই নেই!
ভোটের সকালে ঘুরতে ঘুরতেই সিমলাপাল বাজারের কাছে দেখা তৃণমূলের রাজ্য স্তরের নেতা দিব্যেন্দু সিংহমহাপাত্রের সঙ্গে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি আখের রস পানে ব্যস্ত। প্রথমেই মনে করালেন, খাতড়া মহকুমার মধ্যে তালড্যাংরা বিধানসভা আসনে বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের ‘হাড্ডাহাড্ডি’ টক্কর। তা হলে ভোটের দিন দলীয় তৎপরতাও নিশ্চয় চড়া? দিব্যেন্দু জানালেন, এ দিক-সে দিক থেকে ভোটের খবর পেয়েছেন। তবে প্রার্থীর সঙ্গে কথা হয়নি। নিজেও ভোট দেননি। বললেন, ‘‘দুপুরের পরে ভোট দেব।’’ বলতে বলতেই এক জনের স্কুটারের পিছনে চেপে ‘ব্যক্তিগত’ কাজ সারতে বেরিয়ে গেলেন।
সাতসকালে অবশ্য ভোট দিতে এসেছিলেন রানিবাঁধের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী জ্যোৎস্না মান্ডি। এ বার দল টিকিট দেয়নি তাঁকে। ভোটকেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে টুকটাক কথা সারলেন। বললেন, ‘‘নিজের মতো করে খোঁজ নিয়েছি, দলের এজেন্টরা সবাই বুথে গিয়েছেন কিনা।’’ যদিও তালড্যাংরা বিধানসভা আসনের তৃণমূল প্রার্থী ফাল্গুনী সিংহবাবু বলেছেন, ‘‘দলনেত্রী বলার পরেও যাঁরা ভোটে গা-ঝাড়া দিয়ে নামেননি, তাঁরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।’’
বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের তিনটি আসন— রানিবাঁধ, রাইপুর, তালড্যাংরা এবং অন্য দিকের বিষ্ণুপুরে বিজেপি বেশ শক্তিশালী। সেয়ানে-সেয়ানে টক্কর হবে, সে কথা অনেকেই আঁচ করেছিলেন। বিশেষত, কর্মীদের চাঙ্গা করতে মমতা এবং অভিষেক সভাও করেছেন। কিন্তু দলের শীর্ষ মহলের ‘দাওয়াই’ কি নিচুতলায় পৌঁছয়নি? বিভিন্ন তল্লাটে কোথাও দলের শিবিরে বসে মুড়ি চিবোতে বা ঝিমোতে দেখা গিয়েছে তৃণমূল কর্মীদের। তাঁদের হাবেভাবেও সেই ঝাঁজ নেই।
রাইপুর থেকে বারিকুল যাওয়ার রাস্তায় শালবনি বুথে রাস্তার দু’পাশে বিজেপি-তৃণমূলের শিবির। কিন্তু যুযুধান ভাব নেই। সাংবাদিক পরিচয় পেতেই তৃণমূলের শিবিরে থাকা বীরেন চৌনি নামে এক কর্মী বললেন, ‘‘আমাদের মধ্যে কোনও ভেদ নেই। এই তো সবাই মিলে ছোলা-মুড়ি খাচ্ছি।’’ সে কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলেও, বিজেপি কর্মী স্বপন সর্দার একটু চড়া গলায় বললেন, ‘‘বুথের ভিতরে লিড কিন্তু বুঝে নেব।’’
রাঢ়বঙ্গের এই তল্লাটে বিজেপির শরীরী ভাষা তুলনায় চড়া। পথেঘাটে পদ্ম-পতাকার যেমন ছড়াছড়ি, তেমনই গ্রামে-গঞ্জের অলিগলিতে গেরুয়া উত্তরীয়ধারীদের ভিড়ও ধরা পড়েছে। বিকেলে বিষ্ণুপুরের রাধানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রের একটু তফাতেও দেখা গিয়েছে গেরুয়া উত্তরীয়ের ভিড়। কিন্তু তৃণমূলের নিশানধারী তেমন কাউকে চোখে পড়েনি। ‘‘তৃণমূলের লোকজন নেই?’’— জানতে চাওয়ায় গলায় গেরুয়া গামছা জড়ানো এক যুবক বললেন, ‘‘ওদের এ বার দাঁড়াতেই দিইনি। দেখছেন না, জায়গায় জায়গায় বসে ওরা মুড়ি খেতে ব্যস্ত?’’ তৃণমূলের বাঁকুড়া সাংগঠনিক জেলা সম্পাদক সুব্রত মহাপাত্র অবশ্য বলছেন, ‘‘ভোটের দিন মুড়ি খাওয়া আমাদের দলীয় সংস্কৃতি। ও নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। তা ছাড়া, দলের সব নেতা-কর্মী ভোটে মন-প্রাণ দিয়ে কাজ করেছেন।’’ ভোট-বৃক্ষের নাম কি, পরিচয় হয়তো মুড়িতেই।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে