খেলবে কোথায়? (বাঁ দিক থেকে) ছিল খেলার মাঠ। সেই কুসুম মাঠে এখন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। পাঁচবাগা মাঠে জমে দোকানদারদের ফেলা আর্বজনা। ছবি: অভিজিৎ সিংহ।
কয়েক দশক আগের কথা। পাঁচবাগায় একপাল ছেলে বিকেলে ফুটবল খেলত। সেই মাঠে খেলাধুলা করে বেড়ে ওঠা এলাকার যুবক পরিতোষ দত্তের আক্ষেপ, তখন মাঠটা কত বড় ছিল। এক সঙ্গে আশপাশের বহু পাড়ার ছেলেরা আলাদা আলাদা ভাবে খেলতেন। একই মাঠে কতগুলো খেলা হতো। আর এখন মাঠের আশাপাশে ঘরবাড়ি, দোকান মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। মাঠটা আগের থেকে ছোট হয়ে গিয়েছে।
আগে বড়বড় ফুটবল ও ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো পাঠক পাড়ার মাঠে। বছর খানেক আগে বাঁকুড়া পুরসভা সেই মাঠের চারপাশ ঘিরে দেয় লোহার জাল দিয়ে। মাঠে ঢোকাই বন্ধ হয়ে গেল স্থানীয় ছেলেদের। মাঠটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আগাছার জঙ্গল হয়ে গিয়েছে। কোনও একপাশে অল্প কিছু ছেলে বল নিয়ে খেলাধুলা করে। এলাকার যুবক সুদীপ সরকারের ক্ষোভ, ‘‘যখন এই মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা চলত। ছেলেরাই মাঠটি পরিষ্কার রাখত। এখন খেলাও বন্ধ, মাঠও ভরছে আবর্জনায়।’’
গন্ধেশ্বরী নদীর পাড়ে কুসুম সিনেমা হলের পিছনে ছিল বিস্তীর্ণ একটি মাঠ। শহরের প্রথম শ্রেণির ক্লাবের ছেলেরা সেখানে বিকেলে খেলাধুলার চর্চা করত। গত পাঁচ বছরে মাঠটির ছবিটাই বদলে গিয়েছে। প্লট করে জমি বিক্রি হয়ে গিয়েছে। সে দিনের মাঠের উপর এখন তৈরি হয়েছে ঘর বাড়ি। বিস্তীর্ণ মাঠ ছোট হতে হতে কার্যত বাড়ির আঙিনা হয়ে গিয়েছে।
খেলার মাঠ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে বাঁকুড়া শহরে। এক দিকে যেমন একের পর মাঠে তৈরি হয়ে যাচ্ছে বাড়ি ঘর, অন্যদিকে কিছু মাঠ আবার সংস্কারের অভাবে ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ শহরের ক্রীড়া প্রেমীরা। জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যকরী সভাপতি সুব্রত দরিপার আক্ষেপ, শহরের অন্যতম প্রাচীন দু’টি স্কুল বঙ্গবিদ্যালয় ও হিন্দুস্কুলের মাঠ দু’টি প্রথম শ্রেণির মাঠের মধ্যেই ধরা হতো। মাঠের পাশে বস্তি গড়ে উঠে ও জবর দখল হয়ে গিয়ে বঙ্গবিদ্যালয়ের মাঠটাই হারিয়ে গিয়েছে। হিন্দুস্কুল মাঠ সংলগ্ন বস্তির লোকজন ওই মাঠে গিয়ে প্রাকৃতিক কাজ সারেন। ফলে মাঠটি নোংরা আবর্জনায় ভরে থাকে। তিনি বলেন, “আমাদের ছেলেবেলায় এই দু’টি মাঠ খেলাধুলার আদর্শ জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেরা বঙ্গ বিদ্যালয়ের মাঠে খেলার সুযোগই পেল না। হিন্দু স্কুলের মাঠে তবু নোংরা আবর্জনার মধ্যেই কিছু ছেলে খেলাধুলা করে।”
শহরের বিভিন্ন পাড়ার মধ্যেও ফাঁকা জায়গায় খেলাধুলা করত কচিকাঁচারা। সেই জায়গাগুলিতেও এখন ঘরবাড়ি হয়ে উঠে গিয়েছে বলে জানাচ্ছেন বাসিন্দারা। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “আজকাল শহরে খেলার জায়গা খুঁজে পেতে মাথার চুল ছিঁড়তে হচ্ছে। আমাদের সময়ে পাড়ায় পাড়ায় ফাঁকা জায়গা থাকত। খেলার জায়গা খুঁজতে সমস্যা হতো না। শহর যত ঘিঞ্জি হচ্ছে, ঘরবাড়ি গড়ে উঠছে, সমস্যাটা ততই তীব্র ভাবে প্রকট হচ্ছে।” তিনি জানাচ্ছেন, কাটজুড়িডাঙার ক্ষুদিরাম সরণি এলাকার একটি মাঠে গত বছরেও খেলাধুলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। এ বছর সেই মাঠের একাংশে ঘরবাড়ি তৈরি হয়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই সঙ্কীর্ণ হয়ে গিয়েছে মাঠটি। আশ্রমপাড়ার বিবেকানন্দ পল্লি এলাকাতেও একটি মাঠ ছিল। কিন্তু সেখানে কয়েক বছর আগে থেকেই ঘরবাড়ি শুরু হয়ে গিয়েছে।
বাঁকুড়া স্টেডিয়ামে ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ফুটবল কোচিংয়ে যোগ দিয়েছে পাটপুরের কিশোর দশম শ্রেণির ছাত্র দেবরাজ বিশ্বাস। সে বলে, “কয়েক বছর আগেও শহরের বিভিন্ন জায়গায় বন্ধুদের সঙ্গে ম্যাচ খেলতে যেতাম। আজকাল সেই মাঠগুলোয় ঘরবাড়ি হয়ে গিয়েছে। খেলাধুলা কি উঠে যাবে না কি?” সে জানায়, মাঠের অভাবে এই স্টেডিয়ামেই শহরের বেশিরভাগ পাড়ার ছেলেরা প্র্যাকটিস করতে আসে। একসঙ্গে অনেকগুলো দল খেলাধুলা করে বলে খেলতে সমস্যা হয় সবারই। শহরে ফুটবল ও ক্রিকেটের কোচিং দেন রাজা মুখোপাধ্যায়। তিনি জানাচ্ছেন, হাতে গোনা ক’টি মাঠ হওয়ায় কোচিং শুরু করার আগে জায়গা পেতে অপেক্ষা করতে হয়। কোচিং দেওয়ার মতো পরিকাঠামোর অভাবও রয়েছে মাঠগুলিতে।
শহরের মাথা তুলছে সুউচ্চ অট্টালিকা। হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক খেলার মাঠ। খেলাধুলার জায়গা নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে তা অবশ্য নজরে পড়েছে জেলা প্রশাসনেরও। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম শহরের তামলিবাঁধ ময়দান ও বাঁকুড়া স্টেডিয়াম নতুন করে সংস্কার করা। এ ছাড়াও বাঁকুড়া স্টেডিয়ামের পাশেই একটি সুইমিং পুল গড়ার উদ্যোগও নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসু বলেন, “তামলিবাঁধ ময়দান ও বাঁকুড়া স্টেডিয়াম সংস্কার, সুইমিংপুল গড়ার পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমরা শীঘ্রই রাজ্যের কাছে এই প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠাব।” তবে তাতে কি আদৌ সমস্যা মিটবে? শহরের ক্রীড়ামহলের দাবি, এই শহরের ভিতরের ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে থাকা মাঠগুলি সংস্কার করলে, বা নতূন করে মাঠ গড়লেই এই সমস্যার সমাধান হবে। ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের এই দাবি জেলাশাসককে জানালে তিনি অবশ্য বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শহরের অন্যান্য মাঠ সংস্কার করা যেতেই পারে। এ ব্যাপারে আমরা আলোচনা করে ব্যবস্থা নেব।”