দামোদরের পেটে তেলকুপির ইতিহাস

দামোদরের অথৈই জল। পাশে দু’টি জীর্ণ দেউল। কিছু দূরে মন্দিরের পাশে অযত্নে পড়ে রয়েছে দেউলের মূর্তি। এটাই বর্তমানের তেলকুপি। অযত্নে সময়ের গ্রাসে নষ্ট হতে বসেছে অতীতের এই বন্দর নগর তৈলকম্প। রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখন লোক গবেষকদের চর্চার বিষয়। তাঁদের মতে, তৈলকম্প লোকমূখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে তেলকুপি হয়েছে। দামোদরের দক্ষিণ পাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সাথে জলপথে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে এই বন্দরেই জৈন ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছিলেন মন্দির নগরী।

Advertisement

শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডল

শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০১৫ ০০:০০
Share:

দামোদরের কোলে টিকে থাকা এক প্রাচীন দেউল। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, কোনও দিন এই দেউলও হয়তো হারিয়ে যাবে। —নিজস্ব চিত্র

দামোদরের অথৈই জল। পাশে দু’টি জীর্ণ দেউল। কিছু দূরে মন্দিরের পাশে অযত্নে পড়ে রয়েছে দেউলের মূর্তি। এটাই বর্তমানের তেলকুপি। অযত্নে সময়ের গ্রাসে নষ্ট হতে বসেছে অতীতের এই বন্দর নগর তৈলকম্প।

Advertisement

রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখন লোক গবেষকদের চর্চার বিষয়। তাঁদের মতে, তৈলকম্প লোকমূখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে তেলকুপি হয়েছে। দামোদরের দক্ষিণ পাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সাথে জলপথে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে এই বন্দরেই জৈন ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছিলেন মন্দির নগরী।

১৮৭৮ সালে জিডি বেগলারের ‘রিপোর্ট অফ আ ট্যুর থ্রু বেঙ্গল প্রভিন্সেস’ রচনাতে এই তেলকুপির মন্দির সম্পর্কে কিছু তথ্য মেলে। যেখানে বেগলার তেলকুপিতে মোট ২২টি মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আবার দেবলা মিত্রের ‘তেলকুপি- আ সাবমার্জড টেম্পল সাইট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বইয়েতে তেলকুপির মন্দির নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। তা থেকে জানা যায়, একদা তেলকুপিতে ২৫-২৬টি মন্দির বা দেউল ছিল। ফলে তেলকুপির অতীতের স্বণর্র্যুগ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

Advertisement

কিন্তু ব্যথা দেয় বর্তমান। কারণ দামোদরের উপরে পাঞ্চেত জলাধার তৈরির পরে এই মন্দিরগুলির বেশিরভাগই চলে যায় নদের গর্ভে। কোনও ভাবে মাথা উঁচিয়ে রয়ে গিয়েছে তিনটি দেউল। তার মধ্যে দু’টিকে বছরের প্রায় সব সময়েই দেখা গেলেও একটি শুধুমাত্র গরমকালে দামোদরের জল কমলে দেখা যায়। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, মন্দিরগুলিকে বাঁচিয়ে জলাধার তৈরি হলে হয়তো তেলকুপির ঐতিহ্য হারিয়ে যেত না। আক্ষেপ আরও রয়েছে, টিকে যাওয়া ওই তিনটি মন্দির ও মূর্তিগুলিরও রক্ষণাবেক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই।

লোক গবেষক তথা চেলিয়ামার বাসিন্দা সুভাষ রায় বলেন, “তেলকুপি গেলেই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কী ভাবে একটা স্বর্ণময় অধ্যায় দামোদরের তলায় চলে গেল! দেউলগুলিকে রক্ষা করার কোনও উদ্যোগই কেউ নিলেন না! যেগুলি রয়েছে, তারও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেই।”

Advertisement

লোক গবেষকদের একাংশের মতে, তেলকুপি নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও মোটামুটি ধরে নেওয়া হয় তৈলকম্প থেকেই তেলকুপি নামটি এসেছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, সংস্কৃতে তৈল মানে তেল। আবার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তৈল মানে এক ধরনের কর এবং কম্প কথাটি এসেছে মূলত কম্পন অর্থাৎ পরগনা। এ থেকে তাঁদের অনুমান, তৈলকম্প বা অধুনা তেলকুপি ছিল কর প্রদানকারী বা করদ রাজ্য। সুভাষবাবুর দাবি, “তেলকুপি নিয়ে প্রাচীন ইতিহাসে কিছু উল্লেখ না থাকলেও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে তৈলকম্পের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কবি লিখেছেন যুদ্ধে যার প্রভাব নদী, পর্বত ও উপান্তভূমি জুড়ে, বিস্তীর্ণ পর্বত কন্দরের রাজবর্গের যিনি দর্প দহনকারী, দাবানলের মতো সেই তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর। আবার রামচরিতম কাব্যর উল্লেখিত রুদ্রশিখর যে তৈলকম্পের রাজা ছিলেন, তা জানা যায় জয়পুরের দেওলঘাটার বোড়ামে একটি শিলালিপি থেকে।

সুভাষবাবু বলেন, “তৈলকম্প রাজ্য দামোদরের দক্ষিণ তীর থেকে কংসাবতীর উত্তর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আবার পশ্চিমে ঝালদা থেকে বুধপুর পর্যন্ত ছিল রাজ্যের সীমানা। তৎকালীন পাল সম্রাট রামপালের সাথে রুদ্রশিখরের বন্ধুত্ব ছিল। ফলে একথা বলাই যায় সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্যে উল্লেখিত রুদ্রশিখর এই তৈলকম্পের রাজা ছিলেন।”

তবে ঠিক কোন সময়ে তৈলকম্প বা তেলকুপিতে মন্দিরগুলি গড়ে উঠেছিল, কারাই বা মন্দিরগুলি তৈরি করেছিলেন সেই বিষয়ে প্রামান্য নথি পাওয়া যায়নি। কিন্তু জেলার লোক গবেষকদের একাংশের মতে, মন্দিরগুলির নির্মাণ মোটামুটি দশম-একাদশ শতাব্দীতে। এবং তা মূলত গড়ে ছিলেন জৈন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা। ততকালীন সময়ে বাংলায় পালযুগে জৈন ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল.এবং ধর্মের প্রসারে ভূমিকা নিয়েছিল জৈন ব্যবসায়ীরাই। যাঁরা এই অঞ্চলের দু’টি তামার খনি তামাজুড়ি ও তামাখুন থেকে তামা এনে তৈলকম্প বন্দর থেকে তাম্রলিপ্তে নিয়ে যেতেন।

তবে তেলকুপির সমস্ত মন্দির জৈন ব্যবসায়ীরা তৈরি করেছিল কি না তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ তেলকুপি থেকে পাওয়া মূর্তিগুলির মধ্যে অনেকগুলিই হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি। অনেকে তাই মনে করেন, জৈন ও হিন্দু ধর্মের মিশ্র সংস্কৃতিতে গড়ে উঠেছিল তেলকুপি। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় উল্লেখ করেছেন, তেলকুপির মন্দিরে লিপিস্বাক্ষ্য নেই। তাই সময় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু স্থাপত্যরীতি থেকে মনে হয় এই অঞ্চলে এই রেখবর্গীয় মন্দির নির্মাণ শুরু হয়েছিল নবম-দশম শতকে। চলেছিল অন্তত ত্রয়োদশ শতকের শেষ পর্যন্ত।

শুধু মন্দিরই নয়, স্থানীয় লালপুর, গুরুডি, পাথরবাড়িতে এখনও সাত-আটটি মূর্তিও দর্শনীয়। কিন্তু শিল্পকীর্তির সুষমায় ভরা ওই মূর্তিগুলিও ভগ্নদশাপ্রাপ্ত।

চেলিয়ামারও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। জানব সে কথাও।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement