‘আমার ফসল আমার গোলা’ প্রকল্পে উপভোক্তাদের তালিকায় অবস্থাপন্ন তৃণমূল নেতাদের নাম রয়েছে। বঞ্চিত করা হয়েছে প্রকৃত প্রাপকদের। এমনই অভিযোগ তুলে সেই তালিকা আটকে দিল ব্লক প্রশাসন। একটি সূত্রের খবর, স্বয়ং বিডিও-র হস্তক্ষেপেই এমনটা করা হয়েছে। ঘটনাটি মানবাজার ১ ব্লকের।
দুর্নীতি হচ্ছে দেখেই কি ওই তালিকা আটকে দিয়েছেন? মানবাজার ১ এর বিডিও সত্যজিৎ বিশ্বাস খুলে কিছু বলতে চাননি। তিনি শুধু বলেন, ‘‘কৃষি উপভোক্তাদের একটি তালিকা খুঁটিয়ে দেখার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। বিশদ জানতে হলে জেলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’’ বিডিও অফিসের একটি সূত্রে খবর, জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সোমবার বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে বসেন মহকুমাশাসক। সেখানে দেড় ঘণ্টা টানা বৈঠকের পরেও পুরনো তালিকা ছেড়ে দেওয়া বা তালিকা সংশোধনের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে খবর। মহকুমাশাসক আশিস সাহা কোনও বৈঠকের কথাই মানতে চাননি।
সম্প্রতি কৃষি দফতর থেকে মানবাজার ১ ব্লকের ৪৭ জন চাষির একটি তালিকা প্রকাশ হয়। ওই তালিকায় সহকারি কৃষি অধিকর্তা, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির পাশাপাশি সই করেছিলেন বিডিও নিজেও। ব্লক অফিস সূত্রে খবর, পরে বিডিও তালিকা খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে সেখানে কর্মাধ্যক্ষ, পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য এবং তৃণমূল নেতাদের নিকট-আত্মীয়দের নাম দেখতে পান। এরপরেই বিডিও নিজের সই কেটে দেন বলে দাবি ওই সূত্রের।
এরপরেই গোল বাঁধে।
কেন ওই তালিকা অনুমোদন করা হবে না, সে প্রশ্নে বিডিও-র সঙ্গে এলাকার তৃণমূল নেতাদের ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়। ব্লক অফিস সূত্রের খবর, বিডিও এ বিষয়ে তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় যেতে চাইলেও নেতাদের অনিচ্ছায় বিষয়টি ফলপ্রসূ হয়নি। বিডিও এরপরে গোটা বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আনেন বলে জানা যায়।
আমার ফসল আমার গোলা প্রকল্পে তালিকা তৈরির নিয়ম কী?
পুরুলিয়ার এক সহকারি কৃষি অধিকর্তা জানান, প্রথমে চাষিদের কাছ থেকে দরখাস্ত চাওয়া হয়। তার ভিত্তিতে তালিকা তৈরি হয়। তালিকায় কাদের নাম থাকবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিন জনের একটি কমিটি। তাতে থাকেন কৃষি বিপণন আধিকারিক, ব্লক কৃষি অধিকর্তা এবং বিডিও। এই প্রকল্পে ৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা উপভোক্তারা পেয়ে থাকেন। সাধারণত ফসল কাটার পরে সিমেন্টের চাতাল তৈরি, ফসল রাখার জন্য গুদাম, জমি থেকে ফসল আনা ও বাজারজাত করার জন্য ভ্যান-রিকশা কেনার টাকা দেওয়া হয়।
সিপিএম-কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলির প্রশ্ন, যে তালিকা পুরোপুরি সরকারি আধিকারিকেরা করে থাকেন সেখানে তৃণমূল নেতারা হস্তক্ষেপ করে নিজেদের কিংবা আত্মীয়দের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন। প্রকৃত প্রাপকদের বঞ্চিত করে কৌশলে নিজেদের নাম ঢুকিয়ে নেওয়ায় ওই নেতাদের নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা।
কেন স্বচ্ছ ভাবে তালিকা করা হল না? মানবাজার ১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কবিতা মাহাতোর ফোন বন্ধ থাকায় তার প্রতিক্রিয়া মেলেনি। জেলা পরিষদের সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতো বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি গোটা ঘটনার দায় বিডিও-র উপরে ঠেলেছেন। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘তৃণমূল নেতা হলে কি তিনি চাষি কিংবা প্রকৃত প্রাপক হতে পারেন না?’’
পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী দলনেতা সিপিএমের গোপাল বাউরি পাল্টা মন্তব্য, ‘‘জেলায় কোথায় কী ভাবে দুর্নীতি হচ্ছে সকলেই দেখছেন। গরিব মানুষকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার ফল টের পাবে শাসক দল।’’ মানবাজারের বাসিন্দা সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য প্রদীপ চৌধুরী এক ধাপ এগিয়ে তালিকা সংশোনের দাবি করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘অন্যথায় ব্লক অফিসে স্মারকলিপি দেব। প্রতিবাদে আমরা পথে নামব।’’