নামেই জেলা হাসপাতাল, ভুগছে সেই ‘নেই’ রোগে

তকমাই শুধু বদলেছে। নাম বদলে বিষ্ণুপুর মহকুমা হাসপাতাল এখন জেলা হাসপাতাল। কিন্তু বিষ্ণুপুরবাসীর ক্ষোভ, পরিষেবা সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। নতুন তকমা লাভের তিনবছর পরেও বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরিষেবা সেই তলানিতেই রয়ে গিয়েছে।

Advertisement

স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০০:৩৪
Share:

কে বলবে, এটা হাসপাতাল চত্বর। ঠিক যেন রাস্তার ধারের পার্কিং জোন! ছবি: শুভ্র মিত্র।

তকমাই শুধু বদলেছে। নাম বদলে বিষ্ণুপুর মহকুমা হাসপাতাল এখন জেলা হাসপাতাল। কিন্তু বিষ্ণুপুরবাসীর ক্ষোভ, পরিষেবা সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। নতুন তকমা লাভের তিনবছর পরেও বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরিষেবা সেই তলানিতেই রয়ে গিয়েছে।

Advertisement

হাসপাতালে রোগী ভর্তি করাতে ঢুকলেই এখানকার অব্যবস্থার ছবিটা মালুম হয়। গাড়ি রাখার নির্দিষ্ট কোনও জায়গা নেই। জরুরি বিভাগের সামনে অনেকটা জুড়ে সারি দিয়ে গাড়ির লাইন। কখনওবা জরুরি বিভাগের দরজা আটকে সাইকেল, মোটরবাইক রাখা থাকে। ফলে অ্যাম্বুল্যান্সে রোগী এনে জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে পরিজনেরা হিমসিম খান। এখনও পাঁচিল তৈরি হয়নি। ফলে হাসপাতালের যত্রতত্র কুকুর, বিড়াল, শুয়োর, গরুর অবাধ বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

এতো গেল বিষ্ণুপুর হাসপাতালের বহিরঙ্গের ছবি। ভিতরের অবস্থা আরও খারাপ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তকমা বদলের পরে পরিবর্তন বলতে শুধু হাসপাতাল ভবন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের রং নীল-সাদা করা হয়েছে মাত্র। তা ছাড়া পরিষেবা বদলায়নি। বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে শুধুই চিকিত্‌সক নেই, পর্যাপ্ত কর্মী নেই, নেই নিরাপত্তার বালাই এই অভিযোগই শোনা যায়।

Advertisement

চারমাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ মানসিক বিভাগ। কেন? চিকিত্‌সক নেই। শল্য চিকিত্‌সক একজন। অস্থি বিশেষজ্ঞও একজন। ফলে তাঁরা ছুটিতে গেলে দু’টি বিভাগ সামাল দেওয়ার কেউ নেই। তাঁরা ছুটিতে থাকলে বিভাগ বন্ধ। চিকিত্‌সা করাতে এসে তখন কার্যত শূন্য হাতে রোগীদের ফিরে যেতে হয়। শল্য চিকিত্‌সক না থাকায় বাঁকুড়া মেডিক্যালে স্থানান্তর করার সময় দুর্ঘটনায় আহত একজনের মৃত্যুকে ঘিরে কয়েকবছর আগে উত্তাল হয় বিষ্ণুপুর হাসপাতাল। কিন্তু টনক নড়েনি স্বাস্থ্য দফতরের। কিছুদিন আগেও শিশু বিভাগে চিকিত্‌সক ছিলেন চারজন। এখন কমে তিন। একই অবস্থা প্রসূতি বিভাগেও। সেখানেও চিকিত্‌সকের সংখ্যা চার থেকে কমে তিন হয়েছে। অথচ এই দুই বিভাগেই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মী জানান, ইদানীং তাঁদের কাজের চাপ বেড়েছে। কিন্তু গত এক বছরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী সংখ্যাও ৪৩ থেকে নেমে হয়েছে ৩২। প্রাপ্তি বলতে এই হাসপাতালে আগুনে পোড়া রোগীদের জন্য চালু হয়েছে বার্ন ইউনিট। বাকি চিকিত্‌সা পরিষেবা আঁধারেই।

কার্যত সব বিভাগে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিত্‌সক কম থাকায় রোগীদের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। তাঁদের অফিযোগ, দুর্ঘটনাজনিত কোনও বড় অস্ত্রোপচার হোক বা কোনও বড় অসুখে আসা রোগীদের বাঁকুড়া মেডিক্যালে স্থানান্তরিত করতে পারলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। বিষ্ণুপুর ছাড়াও সোনামুখী, কোতুলপুর, জয়পুর, ইন্দাস, পাত্রসায়র, তালড্যাংরা, ওন্দা এমনকী পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা থেকেও দৈনিক প্রচুর রোগী আসেন এই হাসপাতালে। বহির্বিভাগে চিকিত্‌সক না পেয়ে ফিরে যাওয়া কোতুলপুরের এক মানসিক রোগীর আত্মীয় প্রভাত দত্ত বলেন, “চার মাসের বেশি হল ডাক্তারকে বসতে দেখছি না। কবে আবার দেখাতে পারব তাও কিছু জানা যাচ্ছে না। কী যে সমস্যায় পড়া গিয়েছে।” রোগীকে নিয়ে নিজেই ট্রলি ঠেলছিলেন গড়বেতার সিদ্ধেশ্বর দাস। তিনি বললেন, “জেলা হাসপাতালের এই নমুনা! একটা ট্রলিম্যানও খুঁজে পেলাম না। পরিবারের লোকেদেরই ট্রলি ঠেলে রোগীকে নিয়ে যেতে হচ্ছে।”

ভিতরে আবার শয্য যে মিলবে তার নিশ্চয়তাও নেই। হাসপাতালের এতগুলি বিভাগে মোটে শয্যা সংখ্যা ২৫০টি। ফলে কিছু বেড এলেও তা পাতার জায়গা নেই। রোগীদের অনেক সময় ঠান্ডা মেঝেই শুয়ে থাকতে হয়। পরিষেবার হাল নিয়ে ক্ষোভ লুকিয়ে রাখতে পারেননি তৃণমূলের কাউন্সিলর তথা বিষ্ণুপুরের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তিনি বলেন, “সমস্যাগুলি নিয়ে হাসপাতাল সুপারকে আগেও বলেছি। কিন্তু কাজ এগোচ্ছে কই?” হাসপাতাল সুপার সুভাষচন্দ্র সাহাও স্বাস্থ্যকর্মী থেকে চিকিত্‌সক কমের কথা মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সব জানেন। তবে আশাকরি বেশিদিন এই সব সমস্যা থাকবে না। খুব তাড়াতাড়ি এই সব সমস্যা কাটবে বলেই আমি আশাবাদী।”

বিষ্ণুপুরের জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সুরেশ দাস বলেন, “এই হাসপাতালেরই পাশেই সদ্যোজাত শিশু পরিচর্চা কেন্দ্র গড়া হচ্ছে। সেখানে দোতলায় ৩০টি শয্যা থাকছে। নীচে সিটি স্ক্যান ও ডায়ালিসিস ইউনিট খোলা হবে। অন্য সমস্যাগুলিও কাটিয়ে ওঠার কথাবার্তা চলছে।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement