ব্লক প্রশাসনের অনুষ্ঠানে মন্ত্রী।
তৃণমূল রয়েছে তৃণমূলেই।
রাজ্য নেতৃত্ব গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বন্ধ করতে বারেবারে জেলায় এসে বৈঠক করছেন। দু’দিন আগেও দলের পর্যবেক্ষক অরূপ বিশ্বাস এসে দিনভর বৈঠক করে উন্নয়নে জোর দিতে বলে গিয়েছে। কিন্তু বছরের শুরুতে দলের প্রতিষ্ঠা দিবসেই ফের জোট ভেঙে আলাদা ভাবে অনুষ্ঠান করলেন তৃণমূলের নেতারা।
পূর্বস্থলীতে যেমন বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায় ও জেলা পরিষদ সদস্য বিপুল দাসের দ্বন্দ্ব বেশ পুরনো। বহু বৈঠকে পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন তাঁরা। উপর মহলের নেতাদের কাছে পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগও করেছেন। তবে সম্প্রতি অরূপবাবু একসঙ্গে অনুষ্ঠানের কথা বলে যেতে তৃণমূল স্তরে ধারনা হয়েছিল, ১ জানুয়ারি নেতারাও কল্পতরু হয়ে একসঙ্গে দলীয় উৎসব করবেন। কিন্তু কার্যত দেখা গেল, এক জন মিছিল, পথসভা করলেন, আরেক জন দলীয় দফতরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চলে গেলেন অন্যত্র। জিজ্ঞেস করায় বিধায়ক জানালেন, তাঁকে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। আর বিপুলবাবুর দাবি, ডাকার পরেও বিধায়ক আসেননি। আলাদা করে অনুষ্ঠান করছেন সে কথাও জানাননি।
বৃহস্পতিবার পুরুলিয়ার বান্দোয়ানেও ব্লক প্রশাসন ও ব্লক তৃণমূল আলাদা ভাবে ‘জঙ্গলমহল উৎসবে’র আয়োজন করে। কিলোমিটার খানেকের ব্যবধানে একই ব্যানারে আলাদা মঞ্চে অনুষ্ঠান হয়। জেলার মন্ত্রী তথা দলের জেলা সভাপতি শান্তিরাম মাহাতো অবশ্য প্রশাসনের অনুষ্ঠানেই গিয়েছিলেন। তবে দলের ওই উৎসবে কী হচ্ছে তা জানতে পাঠান জেলা কোর কমিটির নেতা নব্যেন্দু মাহালিকে। তবে বৃহস্পতিবার সমান্তরাল উৎসবে ক্ষোভ দেখালেও শুক্রবার ‘জঙ্গলমহল উৎসব’ বিতর্কে বান্দোয়ানের বিডিও এবং পঞ্চায়েত সমিতির পাশেই দাঁড়ালেন জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। নবেন্দুবাবু বলেন, ‘‘এ ধরনের অনুষ্ঠান হলে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি তার দায় বর্তাবে। তাই বান্দোয়ানের দলের নেতাদের বলেছি ভবিষ্যতে বিডিও বা পঞ্চায়েত সমিতির জনপ্রতিনিধির উন্নয়নের কাজে সহযোগিতা করতে হবে।’’ শান্তিরামবাবুরও মন্তব্য, ‘‘সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আশা করছি শীঘ্র সব মিটে যাবে।’’ জেলা নেতৃত্বের মনোভাব জানার পরে বান্দোয়ানের ব্লক নেতৃত্বের একাংশ এখন স্বীকার করছেন, ‘‘আমরা বিডিও-র সঙ্গে সংঘাতে যেতে চাই না। এলাকার শিল্পীদের আবেগকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য আমরা তালিকায় আরও নাম ঢোকানোর অনুরোধ করেছিলাম তাঁকে। বিডিও তা মানেন নি। তাতেই সমস্যা হয়েছিল।’’
তৃণমূলের সেই একই অনুষ্ঠান। বৃহস্পতিবার তোলা নিজস্ব চিত্র।
গত বুধবার বর্ধমানের কাছারি রোডে দফায় দফায় দলের নানা স্তরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। তাঁর বার্তা ছিল, বিধানসভা ভোটের আগে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ভুলে উন্নয়নের বার্তা নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে। দলের প্রতিষ্ঠা দিবস থেকেই এক হয়ে রাজ্য সরকার কী কী উন্নয়ন করেছে, তা মানুষকে জানাতে বলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একসঙ্গে তো দূর, বরং দ্বন্দ্বই প্রকট হয়ে উঠল শুক্রবার। জেলা সিপিএমের এক নেতার কটাক্ষ, ‘সবোর্চ্চ নেতা যতই ধমক দিন, তৃণমূলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বন্ধ হবে না।”
এ দিন পারুলিয়া বাজারে বিপুলবাবু ও পূর্বস্থলী বাজারে তপনবাবু আলাদা অনুষ্ঠান করেন। বিধায়ক সকালে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা তুলে হাসপাতালের একটি অনুষ্ঠানে চলে যান। অন্য দিকে, বিপুলবাবুর নেতৃত্বে নানা বাজনা, দলনেত্রীর মডেল সাজিয়ে মিছিল বেরোয়। বিপুলবাবুর অভিযোগ, “অরূপবাবু বৈঠক করে বিধায়ককে আমাদের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি না এসে আলাদা করে অনুষ্ঠান করেছেন। সেই অনুষ্ঠান সম্পর্কেও আমরা অন্ধকারে ছিলাম।” বিধায়ক তপনবাবুর পাল্টা জবাব, ‘‘আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাই যাইনি।’’ তাঁর দাবি, ‘‘পূর্বস্থলীতে আমরা আড়ম্বর করে কোনও অনুষ্ঠান করিনি বলে কাউকে আমন্ত্রণও জানাইনি।”
একই এলাকায় আলাদা ভাবে প্রতিষ্ঠা দিবস পালনের উদাহরণ রয়েছে জেলার অন্যত্রও। মেমারি ২ ব্লক তৃণমূলের সভাপতি তথা জেলা পরিষদের খাদ্য কর্মাধ্যক্ষ মহম্মদ ইসমাইল সাতগেছিয়া বাজারে অনুষ্ঠান করেন। কিন্তু সেখানে দেখা যায়নি মেমারি ২ পঞ্চায়েত সভাপতি অমল বাগকে। তৃণণূলের একাংশ কর্মীদেরই দাবি, মহম্মদ ইসমাইলের সঙ্গে অমল বাগের দ্বন্দ্ব চরমে। কয়েক মাস আগে পঞ্চায়েতের উপ নির্বাচনে মহম্মদ ইসমাইলেরা প্রার্থী দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে নির্দল প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলেন অমল বাগেরা। পরে অবশ্য অমলবাবুর গোষ্ঠীই জেতে। জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ বলেন, “পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।” অমলবাবু সরাসরি জানিয়েছেন, মেমারিতে দলের অনুষ্ঠান থাকায় তিনি ওই অনুষ্ঠানে যাননি। ভাতারেও বিধায়ক থেকে জেলা পরিষদ সদস্য, পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষরা নিজের মতো করে অঞ্চল ভিত্তিক দলের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করেছেন। বিধায়ককে ডাকার প্রয়োজনও মনে করেননি দলের বিরোধী গোষ্ঠীর নেতারা। পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ মানগোবিন্দ অধিকারীর এক অনুগামী বলেন, “অরূপবাবু ভাতারের প্রবীণ নেতা পরেশ সরকারকে বৈঠক ডাকার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি দু’টি বৈঠক ডেকেওছিলেন। হঠাৎ বিধায়ক ব্লকের প্যাডে একটি বৈঠক ডাকলেন, আর সেই চিঠি দেওয়া হল রেজিস্ট্রি করে! এর পরেও কী বিধায়ক আমাদেরকে নিয়ে চলতে চান।” রায়না, জামালপুরেও একই কালনা শহরেও বিধায়ক বিশ্বজিৎ কুণ্ডুর অনুষ্ঠানে তাঁর বিরোধী বলে পরিচিত নেতাদের দেখা যায়নি।
সারা দিনের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের নানা উদাহরণ শুনে অস্বস্তিতে পড়ে যান জেলা সভাপতি (গ্রামীণ) স্বপন দেবনাথ। তবে অস্বস্তি এড়িয়ে বলেন, ‘‘একাধিক জায়গায় দলের প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হলে, ক্ষতি কী?”