বৃষ্টি নামতেই বাড়ল পুজোর জাঁক

আজ সোমবার অঘোষিত বন্‌ধ হতে চলেছে পুরুলিয়ায়। তার আভাস মিলল রবিবারই। বিকেলের পর থেকেই কার্যত বন্ধ হতে শুরু করে দোকানপাট। রাস্তায় কমে যায় বাস, ট্রেকারের সংখ্যাও। কারণ আজ সোমবার প্রথা মেনে ভাদ্র মাসের প্রথম দিনে মনসা পুজোয় মাততে চলেছে তামাম পুরুলিয়াবাসী।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৮ অগস্ট ২০১৪ ০১:১৯
Share:

চলছে হাঁস পছন্দ। আদ্রার বাজারে রবিবার।—নিজস্ব চিত্র।

আজ সোমবার অঘোষিত বন্‌ধ হতে চলেছে পুরুলিয়ায়। তার আভাস মিলল রবিবারই। বিকেলের পর থেকেই কার্যত বন্ধ হতে শুরু করে দোকানপাট। রাস্তায় কমে যায় বাস, ট্রেকারের সংখ্যাও। কারণ আজ সোমবার প্রথা মেনে ভাদ্র মাসের প্রথম দিনে মনসা পুজোয় মাততে চলেছে তামাম পুরুলিয়াবাসী। জেলার বিভিন্ন হাটে-বাজারে শনিবার থেকেই বিক্রি হয় হাজার-হাজার হাঁস। রবিবারও দিনভর বেচাকেনা চলল। কোথায় চড়াদামে হাঁস কিনে ব্যাজার মুখে ঘরের পথ ধরলেন ক্রেতারা, আবার কোথাও চলল দর কষাকষি।

Advertisement

রবিবার সারাদিন উপবাসের পরে রাতে পুজো দেওয়া হয়। সোমবার বাড়ি বাড়িতে চলে হাঁস বা পাঁঠার মাংস খাওয়া। বছরের পর বছর রাজ্যের এই প্রান্তিক জেলায় এই রীতি চলে আসছে। লোক গবেষকদের মতে, জীবন জীবিকার স্বার্থেই মাঠে, ঘাটে, জঙ্গলে জলা জায়গায় কাজ করতে হয় পুরুলিয়ার বাসিন্দাদের। ওই সব এলাকা সাপ থাকে। তারই প্রেক্ষিতে এই জেলায় মনসা পুজোর চল। চেলিয়ামার বাসিন্দা লোক গবেষক সুভাষ রায় বলেন, “মাঠ-ঘাট, জল, জঙ্গলে কাজ করার সময়ে সাপের ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়াই শুধু নয়, পুরুলিয়ায় মনসা পুজো করার শুরুর পিছনে সামাজিক তাত্‌পর্যও আছে। ভাদ্র মাসের প্রথমে চাষের কাজ প্রায় শেষ হয়ে যায়। টানা দু’মাসের হাড়ভাঙা খাটুনির পরে মানুষ বিশ্রাম ও বৈচিত্র্য চায়। তাই পুরুলিয়ায় মনসা পুজোর বহু সংখ্যক মানুষ মেতে থাকেন।” লোক গবেষকদের মতে, মধ্যযুগে জাঙ্গুলি দেবীর পুজো বা জৈন ধর্মমতে পদ্মাবতী দেবীর পুজোর ধারাবাহিকতায় এসেছে মনসা পুজো। সুভাষবাবু বলেন, “পদ্মাবতীর মূর্তিতে প্রচুর সাপ দেখা যায়। আর পুরুলিয়া জেলা জুড়েই জৈন ধর্মের প্রভাব রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রভাবের কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মনসা পুজো।”

মনসা পুজোর দিন ও রাতে গোটা জেলা জুড়ে কয়েক লক্ষ হাঁস ও পাঁঠা বলি হয়। সেই মাংস খাওয়া হয় পরের দিন। মানুষজন তাই বাড়ি ছেড়ে বাইরে বের হন না। তাতেই কার্যত বন্‌ধের চেহারা নেয় এই জেলা। পুরুলিয়া শহর থেকে শুরু করে মানবাজার, রঘুনাথপুর-সহ জেলার ২০টি ব্লকেই বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ থাকে। পুরুলিয়া শহরের রেডক্রস রোডের হোটেল মালিক হনুমান কর্মকারের কথায়, “মনসা পুজোয় শহরে লোকজনই আসেন না। দোকান খুলব কার ভরসায়? রবিবার বিকেলেই হোটেল বন্ধ করে দিয়েছি। আমরাও বাড়িতে গিয়ে পুজোয় মাতব।”

Advertisement

তবে এ বার পুজোর আয়োজনে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছিল বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে। প্রথম দিকে বর্ষার ঢিমেতালের জন্য চাষের কাজ ব্যাহত হয়। কিন্তু গত কয়েকদিনে বৃষ্টি ঘাটতি অনেকটা মিটিয়ে দেওয়ায় চাষিরাও খুশি। ফলে মনসা পুজোর চেনা মেজাজটা ফিরে এসেছে। তার ছবি ধরা পড়েছে রবিবার। এ দিন সকালের দিকে কার্যত ভিড়ে ঠাসা ছিল মানবাজারের ব্যাঙ্ক মোড় বাজার এলাকা। এখানে হাঁসের দাম ছিল যথেষ্ঠ চড়া। প্রতিটি হাঁস বিক্রি হয়েছে ৩০০-৩৫০ টাকা দরে। একই ছবি আদ্রা বড়হাট, বোরো থানার খড়িদুয়ারি, হুড়ার লালপুর, পুরুলিয়া মফস্‌সলের মাগুড়িয়া বা বন্দোয়ানের বাজারে। মাঝারি আকারের পাঁঠা বিক্রি হয়েছে ২৭০০-২৯০০ টাকায়। বোরো থানার চিরুগোড়া গ্রামের বাসিন্দা সরস্বতী মাহাতো বলেন, “বাড়িতে বড় করেই পুজো হয়। এ বার বর্ষায় বৃষ্টি কম হওয়ায় ভেবেছিলাম ছোট করে পুজো করতে হবে। তবে শেষ দিকে বৃষ্টি ভাল হওয়ায় চাষ খুব একটা খারাপ হয়নি। সেই আশাতেই শেষ পর্যন্ত ধারদেনা করেই পুজো করছি।” একই কথা শুনিয়েছেন মানবাজারে সুফল মাহাতোও। মানবাজার ব্যবসায়ী সমিতির কর্মকর্তা আনন্দময় সেনের কথায়, “বরাবরই মনসা পুজোর আগে বিক্রিবাটা ভালোই হয়। তবে এ বার বাজার কিছুটা মন্দা ছিল। শেষবেলায় অনেকটাই পুষিয়ে গিয়েছে।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement