শুরু হয়েছে ভৈরববাঁকি কজওয়ের কাজ

মুখ্যমন্ত্রী বলার পরে দু’বছর পার

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ধমানে গিয়ে বুধবার শততম প্রশাসনিক বৈঠক করলেন। দু’বছর আগে বাঁকুড়ায় এক প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নিজের এলাকার জন্য একটি সেতু চেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি পেয়ে গিয়েছিলেন জঙ্গলমহলের এক বিডিও। কিন্তু কাজ শুরু হতেই গড়িয়ে গেল বছর। বর্ষা এসে গেলেও সেই সেতু না হওয়ায় এ বারও বানে ডোবা কজওয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।

Advertisement

দেবব্রত দাস

শেষ আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৫ ০২:১৩
Share:

কাজ শুরু হয়েছে কজওয়ের। লক্ষ্যমাত্রা দু’বছর। ফলে, আগামী দু’বারও বর্ষায় ভাসার আশঙ্কা বাসিন্দাদের। ছবি: উমাকান্ত ধর

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ধমানে গিয়ে বুধবার শততম প্রশাসনিক বৈঠক করলেন।
দু’বছর আগে বাঁকুড়ায় এক প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নিজের এলাকার জন্য একটি সেতু চেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি পেয়ে গিয়েছিলেন জঙ্গলমহলের এক বিডিও। কিন্তু কাজ শুরু হতেই গড়িয়ে গেল বছর। বর্ষা এসে গেলেও সেই সেতু না হওয়ায় এ বারও বানে ডোবা কজওয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
বারিকুল থানার অমৃতপাল গ্রামের কাছে, বাঁকুড়া–ঝাড়গ্রাম রাজ্য সড়কে ভৈরববাঁকি নদীর কজওয়ের পাশে উঁচু সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। দু’বছর আগে জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ওই সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিলেন রাইপুরের তদানীন্তন বিডিও কিংশুক মাইতি। বিডিও-র কাছ থেকে বিষয়টি শুনেই অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে সেতু নির্মাণের জন্য শীঘ্রই অর্থ বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সেই আশ্বাসের একবছর পরে ওই সেতু নির্মাণের জন্য প্রাথমিক ভাবে ৫ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু কাজ শুরু হল সম্প্রতি। দাবিপূরণ হতে যাচ্ছে দেখে বাসিন্দারা খুশি হলেও কাজের গতি নিয়ে অসন্তুষ্ট তাঁরা।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের খবর, ভৈরববাঁকি নদীর উপরে প্রায় ১৫০ ফুট লম্বা ও ১২ ফুট চওড়া এই কজওয়েটি তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। তারপর ওই কজওয়েতে কংক্রিটের ঢালাই দেওয়া হয়েছিল গত বামফ্রন্ট জমানায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ফি বর্ষায় দুর্ঘটনা ঘটা এই কজওয়ে যাঁরা পারাপার করেন তাঁদের ভবিতব্য। বহুবার টানা বৃষ্টিতে ফুঁসে ওঠা নদীর জল কজওয়ের উপর দিয়ে তীব্রস্রোতে বয়ে যাওয়ার সময় পথচারী থেকে গবাদিপশু ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে।

Advertisement

বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, ২০০৬ সালের অগস্ট মাসে ওই কজওয়ে পার হওয়ার সময় একটি পিকআপ ভ্যান ভেসে গিয়ে ঝাড়গ্রামের বাসিন্দা দু’জনের মৃত্যু হয়। ২০০৭ সালে ওই কজওয়েতে জলের তোড়ে মারা যান রাইপুরের এক বাসিন্দা। পরের বছর অমৃতপাল গ্রামের এক কৃষকের ১০টি গরু ও মোষ ভেসে যায় জলের তোড়ে। ২০০৯ সালে বক্সির এক শিক্ষক ওই কজওয়েতে জলের স্রোতে উল্টে পড়েও কোনওরকমে প্রাণে বাঁচেন। ২০১১ সালের অগস্ট মাসে ভরা বর্ষায় নদী পেরোতে গিয়ে স্রোতে ভেসে যায় ২০টি গবাদি পশু।

সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ওইদিন জলভর্তি নিচু কজওয়ে পেরোতে গিয়ে ঝাড়গ্রাম থেকে বাঁকুড়াগামী একটি বেসরকারি বাস জলের স্রোতে ভেসে যায়। প্রাণ যায় শিশু, মহিলা-সহ ৮ জনের। দুর্ঘটনার পরেরদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন রাজ্যের মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এর পরেই ওই নদীতে উঁচু সেতুর দাবি জোরদার হয়। এরপরেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে সুযোগ পেয়ে ওই সেতু তৈরির কথা তোলেন বিডিও।

Advertisement

কিন্তু প্রশাসন সূত্রে খবর, সেতুর জন্য অর্থ বরাদ্দের পরে টেন্ডার ডাকতেই ছ’মাস পেরিয়ে যায়। চলতি বছরে এপ্রিল মাসে ওই সেতু তৈরির ওয়ার্ক অর্ডার বের হয়। এরপর গত ৯ মে থেকে সেতু তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার এতদিন পরে সেতু তৈরির কাজ শুরু হওয়ায় কিছুটা হলেও ক্ষোভ রয়েছে দক্ষিণ বাঁকুড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে। তাঁদের ক্ষোভ, “দুই জেলার মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী বাঁকুড়া-ঝাড়গ্রাম রাজ্য সড়কের মধ্যে এই কজওয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষায় ওই কজওয়ের উপর দিয়ে তীব্র স্রোতে জল যাওয়ায় অনেক সময় বাস চলাচল বন্ধ করে দিতে হয়। আবার ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে গিয়ে দুর্ঘটনাও তো ঘটছে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু হলে এতদিনে সেতুটি তৈরি হয়ে যেত।”

রাইপুর ব্লকের মেলেড়া, ঢেকো, ফুলকুসমা গ্রাম পঞ্চায়েতের পাশাপাশি পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলপাহাড়ির ভেলাইডিহা, জব্বলপুর, লালগড়ের নছিপুর, বিনপুর এলাকার লক্ষাধিক মানুষ তাঁদের প্রয়োজনে প্রায় দিনই রাইপুরে যাতায়াত করেন। পথে ভৈরববাঁকির এই কজওয়ে পেরতে হয় তাঁদের। কিন্তু বর্ষাকালে এই কজওয়ের উপর দিয়ে জল বইতে শুরু করলে সাময়িক ভাবে যান চলাচল ব্যাহত হয়। চরম সমস্যায় পড়েন এলাকার মানুষজন। সাতপাট্টা গ্রামের খান্দু রজক, শ্যামসুন্দরপুর গ্রামের অশোক পাল বললেন, “জল বাড়লেই এই কজওয়ে ডুবে যায়। ফুলকুসমা থেকে রাইপুরের যাতায়াত বন্ধ হয়ে পড়ে। জাতাডুমুর ড্যামের উপর দিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ঘুরপথে যাতায়াত করতে হয়। বাস চলাচল বন্ধ হয়ে পড়লে সকলের অসুবিধা হয়। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের অসুবিধার কথা জেনে সেতু তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন। টাকা বরাদ্দ করেছেন। সেতুর কাজ শুরু হয়েছে। এ বার আমাদের দুর্দশা ঘুচবে।’’ তবে তাঁদের অনুযোগ, “সেতু তৈরির পরিকল্পনা আগে নিলে আরও ভাল হতো। এই বর্ষাতেও নদী পেরোতে অসুবিধা হবে।’’ ঝাড়গ্রাম-বাঁকুড়া রুটের একটি বেসরকারি বাসের কর্মী রাজু মণ্ডল, অশ্বিনী মণ্ডল বলেন, “টানা বৃষ্টি হলে প্রায় দিনই গাড়ি বন্ধ রাখতে হয়। আমরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই। সেতু তৈরি হয়ে গেলে আর এই সমস্যা থাকবে না। যাই হোক দেরিতে হলেও এই সেতু তৈরি হচ্ছে দেখে আমরা খুশি।’’

Advertisement

রাইপুরের বাসিন্দা তথা সিপিএমের বাঁকুড়া জেলা কমিটির সদস্য ধ্রুবলোচন মণ্ডলের কটাক্ষ, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী তো অনেকদিন আগেই ঘোষণা করেছিলেন ভৈরববাঁকি নদীর উপর সেতু হবে। কাজ শুরু হতেই দু’বছর পেরিয়ে গেল। এখন সেতুর কাজ কবে শেষ হবে সেটার দেখার।’’ রাইপুর পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি তৃণমূলের শান্তিনাথ মণ্ডল অবশ্য দাবি করেন, “বামফ্রন্ট সরকার জঙ্গলমহলের মানুষের উন্নয়নের জন্য কিছুই করেনি। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী এই সেতুর প্রয়োজনীয়তা বুঝে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সেতুর অনুমোদন দিয়েছেন। অর্থ বরাদ্দ করেছেন। কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যা বলেছেন বাস্তবে সেই কাজ যে করে দেখাচ্ছেন এই সেতু তারই প্রমাণ। কাজ দ্রুত হচ্ছে।”

রাইপুরের বিডিও দীপঙ্কর দাসও দাবি করেন, ‘‘কাজ দ্রুতগতিতেই হচ্ছে।” রাজ্য পূর্ত দফতরের (সড়ক) খাতড়া সাব ডিভিশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার তপনকুমার পাল বলেন, “ভৈরববাঁকি নদীর উপরে ১০০ মিটার লম্বা, ৭ মিটার চওড়া সেতু নির্মাণের জন্য ৫ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। গত মে মাস থেকেই কাজ শুরু হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেও অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কাজ চলছে। কাজ যে গতিতে চলছে তাতে দু’বছরের মধ্যে সেতুর কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী।” জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিকের দাবি, “মুখ্যমন্ত্রী ওই সেতু নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম দিকে টেন্ডারে ঠিকাদাররা আগ্রহ না দেখানোয় কিছুটা সময় লেগেছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দোষ নেই। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই সেতুর কাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারকে বলা হয়েছে।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement